আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি :
দক্ষিণ এশিয়ায় উত্তেজনার পারদ যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন ভারত সরকারের একাধিক ডিজিটাল পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক নজর কেড়েছে। সম্প্রতি, ভারতের অভ্যন্তরে এক্স (পূর্বতন টুইটার) প্ল্যাটফর্মে পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টোর অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ব্লক করা হয়েছে পাকিস্তানের বর্তমান তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আতাউল্লাহ তারারের এক্স অ্যাকাউন্ট, যিনি একাধিক বার ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধোন্মাদ আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।এই সিদ্ধান্তগুলির পেছনে ভারতের তরফ থেকে সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা না এলেও, সংশ্লিষ্ট স্ক্রিনশট ও বার্তায় দেখা গেছে—"আইনি দাবির ভিত্তিতে এই কন্টেন্ট ভারতে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।" অর্থাৎ, ভারতীয় আইন ও সাইবার নিরাপত্তা নীতির আওতায় এই নিষেধাজ্ঞাগুলি জারি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা, যেখানে ভারত দেখাচ্ছে যে তথ্য-যুদ্ধের ময়দানেও তারা পিছিয়ে থাকবে না।
এই পদক্ষেপগুলির প্রেক্ষাপট ২২ এপ্রিলের পহেলগাঁও সন্ত্রাসী হামলা। জম্মু ও কাশ্মীরের পর্যটন এলাকা পহেলগাঁওয়ে, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার একটি শাখা ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফোর্স’ (TRF) গুলি চালিয়ে ২৬ জন নিরীহ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে। ভারত সরাসরি পাকিস্তানকে এর জন্য দায়ী করে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায় যে, “এই হামলার পিছনে সীমান্ত-পারের পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।” এর পরপরই আতাউল্লাহ তারার দাবি করেন, ইসলামাবাদের কাছে “বিশ্বাসযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য” রয়েছে—ভারত ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে সীমান্তে সামরিক অভিযান চালাতে পারে। ভারত এই বিবৃতিকে “অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা ছড়ানোর প্রচেষ্টা” বলে আখ্যা দেয়, এবং এরপর থেকেই পাকিস্তানি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অ্যাকাউন্ট ব্লকিং শুরু হয়।
রাজনীতিবিদদের অ্যাকাউন্টের পাশাপাশি, ভারত নিষ্ক্রিয় করেছে পাকিস্তানের দুই জনপ্রিয় অভিনেত্রী হানিয়া আমির ও মাহিরা খানের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট। যদিও এসব পদক্ষেপ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি, তবে সূত্রমতে, এই নিষেধাজ্ঞাও ভারতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় ঘটেছে।সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এই ধরনের হস্তক্ষেপ একদিকে সীমান্তের বাইরে পাকিস্তানি বিনোদন সামগ্রীর জনপ্রিয়তাকে খর্ব করতে চায়, অন্যদিকে ভারতীয় অভ্যন্তরীণ মনোভাবকেও প্রতিফলিত করে—যেখানে ‘সীমান্ত-পার যোগাযোগ’কে এখন নিরাপত্তার চোখে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনাগুলিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি, তবে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করছেন, এটি ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এক নতুন তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর শীতল যুদ্ধের সূচনা। এই পদক্ষেপ শুধু রাজনৈতিক নয়, এর প্রতীকী তাৎপর্যও স্পষ্ট—ভারত সরকার দেখাতে চাচ্ছে, রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী বা জনপ্রিয় তারকা—যেই হোন না কেন, ভারতের নিরাপত্তা ও আইনি কাঠামোর সঙ্গে সংঘাতে পড়লে তিনি নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বেন।ওয়াশিংটন, লন্ডন ও ব্রাসেলসের কিছু থিংক ট্যাঙ্ক ইতিমধ্যেই বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। ভারতের এই পদক্ষেপগুলো একদিকে ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব’ রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে, অন্যদিকে পাকিস্তানের তরফ থেকে এটিকে ‘প্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী’ হিসেবে তুলে ধরা হতে পারে আন্তর্জাতিক পরিসরে।
ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক বহুদিন ধরেই নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, কাশ্মীর এবং জলবণ্টন ইস্যুতে উত্তপ্ত। বর্তমানে এই সম্পর্ক আরও জটিল হয়েছে ডিজিটাল ও সাংস্কৃতিক নিষেধাজ্ঞার নতুন মাত্রা যুক্ত হয়ে। সন্ত্রাসবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীল বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার পক্ষে যুক্তি থাকলেও, একই সঙ্গে এই পদক্ষেপগুলোর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ফলাফল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণযোগ্য।এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন থেকেই যায়—উত্তেজনা ও পাল্টা পদক্ষেপের এই ঘূর্ণাবর্তে কি ভবিষ্যতের সংলাপ ও শান্তির পথ আরও দুর্গম হয়ে পড়ছে?
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব