স্পোর্টস ডেস্ক: সান মারিনো সফরের উদ্দেশ্যে আগামীকাল রাতে দেশ ছাড়বে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। এই সফরের ঠিক আগমুহূর্তে আজ অনুশীলন শেষে প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছেন জাতীয় দলের নবনিযুক্ত হাই-প্রোফাইল হেড কোচ থমাস ডুলি এবং অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া। গত ২২ মে শুক্রবার ঢাকায় পা রাখলেও এক সপ্তাহ পর আজই প্রথম মিডিয়ার সামনে নিজের ফুটবল দর্শন, রণকৌশল ও দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের কথা খোলামেলাভাবে তুলে ধরলেন এই সাবেক মার্কিন তারকা।
খেলোয়াড়ি জীবনে জার্মান বুন্দেসলিগা মাতানো এবং বিশ্বকাপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দলকে নেতৃত্ব দেওয়া ডুলির কোচিং ক্যারিয়ারও প্রায় দুই দশকের। স্বাভাবিকভাবেই তার প্রোফাইল বাংলাদেশে আসা সাম্প্রতিক যেকোনো কোচের চেয়ে বেশ ভারী। লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের তিনি কোন কৌশলে খেলাবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে ডুলি তার আধুনিক ফুটবল দর্শনের কথা জানান।
ডুলি বলেন, ‘আমি খেলোয়াড়দের পরিষ্কার বলেছি যে, আমি মাঠে ফুটবল খেলতে পছন্দ করি। আমার রণকৌশলের মূল ভিত্তি হলো- আমরা বলের পেছনে দৌড়াব না, বরং বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রতিপক্ষকে চেপে ধরব। মাঠে আমি ‘৪-২-৩-১’ ছকে পজিশনাল ফুটবল খেলাতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।’
এই পাসিং ও পজিশনাল ফুটবল কার্যকর করতে পাস ও রিসিভের মতো ফুটবলের মৌলিক বিষয়গুলো নিখুঁত করার ওপর জোর দিচ্ছেন এই নতুন গুরু। তিনি যোগ করেন, ‘এর জন্য আমাদের পাসিং এবং রিসিভিংয়ের মতো ফুটবলের বেসিক বিষয়গুলো নিখুঁতের কাছাকাছি হতে হবে। মাঠে প্রত্যেক খেলোয়াড়কে শতভাগ মনোযোগী হতে হবে এবং নিজের দায়িত্বটা ঠিকঠাক বুঝতে হবে।’
দলের আধুনিক প্রেসিং কৌশল নিয়ে ডুলি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘যেমন গতকাল আমরা মাঠে হাই-প্রেসিংয়ের অনুশীলন করছিলাম। আধুনিক ফুটবলে প্রেসিং করতে হলে দলের সবাইকে একসাথে করতে হয়। মাঝমাঠের একজন খেলোয়াড়ও যদি অলসতা করে প্রেস না করে, তবে পুরো পরিকল্পনাটাই মাঠে মারা যাবে। তাই কৌশলটি তাদের মাথায় গেঁথে নিতে হবে।’
খেলোয়াড়দের এই ভুলত্রুটি শুধরে দিতে আধুনিক ভিডিও অ্যানালিসিসের সাহায্য নিচ্ছেন ডুলি। তিনি বলেন, ‘আমরা অনুশীলনের ভিডিও করার পর তা টিভিতে বা স্ক্রিনে দেখিয়ে খেলোয়াড়দের বুঝিয়ে দেব- কোন পরিস্থিতিতে তাদের ঠিক কী করা উচিত ছিল। আমাদের বারবার এই ভুলগুলো ধরিয়ে দিতে হবে, যাতে পরবর্তীতে একই পরিস্থিতিতে পড়লে তারা পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। মূলত এভাবেই আমরা ফুটবলারদের মাঝে একটি পেশাদার চিন্তাভাবনা গড়ে তোলার চেষ্টা করছি এবং এটাই আমাদের মূল ফোকাস।’
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে যত কোচ এসেছেন এর মধ্যে ডুলিই সবচেয়ে হাইপ্রোফাইল। বিশ্বকাপ খেলা একজন ফুটবলার এবং জার্মান কিংবদন্তী ক্লিন্সম্যানের সহকারী হিসেবে কাজ করা একজন কোচ বাংলাদেশে কেন আসলেন? ডুলির উত্তর, বেশ কয়েকটি কারণ আছে। একজন খেলোয়াড় হিসেবে ১৮ বছর বয়সে আমি ১১তম বিভাগে খেলেছি। বিশ্বের সবচেয়ে বাজে লিগ। আর আমি সফল হয়েছি, কারণ কেউ একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল আমি আমার জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট কিনা, আর আমি ছিলাম না।
‘আমি প্রায় সবকিছুই জিতেছি। দ্বিতীয় বিভাগের চ্যাম্পিয়নশিপ, তৃতীয় বিভাগের চ্যাম্পিয়নশিপ, বুন্দেসলিগা, বুন্দেসলিগা কাপ, সুপার কাপ, উয়েফা কাপ, বিশ্বকাপে খেলেছি, হল অফ ফেমে জায়গা পেয়েছি, বর্ষসেরা খেলোয়াড় হয়েছি। এটা কীভাবে সম্ভব হলো? অবসর নেওয়ার পর আমি ভাবছিলাম, আমি আমার কোচিংয়ে এটা কীভাবে প্রয়োগ করতে পারি? কারণ আমি একজন কোচ হতে চেয়েছিলাম। আর আমি সেটা অনূর্ধ্ব-১৮ দলের সাথে করেছি, ক্লাব দলের সাথে করেছি, জাতীয় দলের সাথে করেছি, সমস্ত দলের সাথে করেছি এবং যেসব খেলোয়াড় আমার উপদেশ মেনেছে তারা সফল হয়েছে। আমি ফিলিপাইনে ছিলাম, সেটা বেশ সফল ছিল। আমি এশিয়াকে ভালোবাসি। আমি সত্যিই এশিয়াকে ভালোবাসি। ফিলিপাইনে এবং জার্মানিতে আমার থাকার জায়গা আছে। আমার পরিবার জার্মানিতে থাকে। গায়ানায় ভ্রমণ করার বিষয়ে প্রথমে আমার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু আমি বললাম, "আমাকে ওদের খেলার কিছু ভিডিও দিন।" আমি খেলা দেখলাম এবং বললাম, জানেন তো? আমি যা শেখাই, তাদের ঠিক সেটাই দরকার। আমি তাদের সফল করতে চাই।’
এক সপ্তাহের বেশি সময় ঢাকায় এলেও দিন চারেক মাঠে অনুশীলন করেছেন জামালরা। চার দিনে নতুন কোচ সম্পর্কে অধিনায়ক জামালের উপলব্ধি, ‘উনি অনেক চেষ্টা করতেছেন, যেটা আমি মাত্র বলছি। মানে উনি মিটিং করতেছেন, তারপরে ওয়ান টু ওয়ান কথা বলেন, তারপরে এক্সপ্লেইন করেন। আজকে আমরা আরও আলাপ করবো আর নেক্সট ফিউ ডেইজ আবার ডিসকাস করবো। কারণ আসলে নতুন কোচ আসলে উনার অনেক নতুন আইডিয়া আছে।’
ডুলি খেলোয়াড়ি জীবনে ডিফেন্ডার ছিলেন। তাই গোল হজম করা তার একেবারে অপছন্দ। অল্প দিনেই সেই বার্তা পেয়েছেন জামালরা, ‘আসলে উনি আমার সাথে যেটা ডিসকাস করছে যখন আমরা মিটিং করছি... তা উনি আসলে অ্যানালাইজ দিয়া শো করছে আমরা কিভাবে গোল কনসিড করছি। ঐটাই মেইন থিং, মানে যে সিলি গোলস আমরা কনসিড করছি, ঐটা নিয়ে উনি শো করছে। তারপরেও উনি চায় পাস... পাসিং খুব পছন্দ করে।’
‘আর প্রেসিংটা আমরা কিভাবে ইম্প্রুভ করতে পারি, সেটা নিয়ে বলেছেন। সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট কথা উনি গোল খাইতে চান না, উনি ডিফেন্ডার ছিল। তাই ডিফেন্ডিং নিয়ে তার বিশাল জ্ঞান আছে। তাই আমার ডিফেন্ডারের জন্য এটা মানে খুব খুব ভালো।’
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম