রঞ্জন কৃষ্ণ পণ্ডিত (টাঙ্গাইল): টাঙ্গাইলের আনারসের রাজধানীখ্যাত মধুপুর গড়াঞ্চলের পাহাড়ি লাল মাটিতে কাজুবাদাম চাষে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন কৃষকরা। উঁচু জমি, অনুকূল জলবায়ু এবং লাল মাটির কারণে এ অঞ্চলে কাজুবাদামের ভালো ফলন মিলছে। ফলে এ অর্থকরী ফসলকে ঘিরে মধুপুরে তৈরি হয়েছে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার।
কৃষি বিভাগ তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে পাহাড়ি এলাকাগুলোতে কাজুবাদাম চাষ সম্প্রসারণে কাজ করছে। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চারা রোপণের প্রায় দুই বছর পর থেকেই কাজুবাদাম গাছে ফল আসা শুরু করে। রোপণের সময় গর্তে গোবর ও প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করতে হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে গাছের গোড়ায় নিয়মিত সেচ এবং ফল ধরার সময় সঠিক পরিচর্যা ও পরিমিত সার ব্যবহারে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।
কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রতিটি চারা ৭ থেকে ৮ মিটার দূরত্ব বজায় রেখে রোপণ করা উচিত।
সরেজমিনে দেখা যায়, সবুজ পাতার ফাঁকে ফুটে থাকা গোলাপি ফুল ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে কাজুবাদামে। মনোমুগ্ধকর এ দৃশ্য স্থানীয়দের পাশাপাশি দর্শনার্থীদেরও আকৃষ্ট করছে। ফলে কাজুবাদামের বাগানে কৃষকদের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের উপস্থিতিও বাড়ছে।
কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মধুপুর গড়াঞ্চলের লাল ও অম্লীয় মাটি, উঁচু পাহাড়ি জমি এবং অনুকূল আবহাওয়া কাজুবাদাম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এ মাটিতে আয়রন ও অ্যালুমিনিয়ামের উপস্থিতি গাছের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। পাশাপাশি পাহাড়ি উঁচু জমিতে পানি জমে না থাকাও কাজুবাদাম চাষের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে মধুপুরের কাজুবাদাম স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। বর্তমানে এ অঞ্চলে আনারস, কলা, পেঁপে, আদাসহ বিভিন্ন মিশ্র ফসলের চাষ হচ্ছে। একইভাবে অন্যান্য ফসলের সঙ্গে একই জমিতে কাজুবাদাম চাষও সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয় কৃষক হানিফ মিয়া জানান, কৃষি বিভাগের সহায়তায় চারা সংগ্রহ করে তিনি কাজুবাদাম চাষ শুরু করেন। মাত্র দুই বছরের মধ্যেই গাছে আশানুরূপ ফলন এসেছে। তার সাফল্য দেখে এলাকার অনেক কৃষক এখন কাজুবাদাম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
তিনি বলেন, অন্যান্য ফসলের তুলনায় কাজুবাদাম বেশি লাভজনক হওয়ায় ভবিষ্যতে আনারসের পর এ অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল হিসেবে এটি স্থান করে নিতে পারে।
আরেক কৃষক লিটন মিয়া জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি মধুপুরের লাল মাটিতে আনারস চাষ করছেন। এখন কাজুবাদাম চাষের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন। তার মতে, লাল মাটির খনিজ উপাদান, উঁচু জমির ভালো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং অনুকূল জলবায়ু কাজুবাদাম চাষের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন বলেন, কাজুবাদাম একটি উচ্চমূল্যের ফসল, যার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। মধুপুরের লাল মাটি এ ফসল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। একবার চারা রোপণ করলে ৩৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কাজুবাদাম আমদানি করতে হয়। মধুপুরসহ দেশের পাহাড়ি এলাকায় কাজুবাদাম চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
কৃষি গবেষণা বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আশিকুর রহমান বলেন, টাঙ্গাইলের পাহাড়ি অঞ্চলে কাজুবাদাম চাষ সম্প্রসারণে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। মধুপুরের কৃষকদের নিয়মিত তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, পাহাড়ি লাল মাটিতে পানি জমে না থাকায় এ অঞ্চল কাজুবাদাম চাষের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। পাশাপাশি প্রচলিত মিশ্র চাষ পদ্ধতির সঙ্গে কাজুবাদাম যুক্ত করে কৃষকরা একই জমিতে একাধিক লাভজনক ফসল উৎপাদন করতে পারবেন।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব