| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা ও দিল্লির ৪৯ দিন: ভারতে Gen-Z রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী?

reporter
  • আপডেট টাইম: Jul ২৬, ২০২৬ ইং | ১৮:২৫:০৫:অপরাহ্ন  |  ১০৭৯ বার পঠিত
প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা ও দিল্লির ৪৯ দিন: ভারতে Gen-Z রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী?

আশিস গুপ্ত: 

বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম বা তথাকথিত Gen-Z–এর ভূমিকা এখন রাজনৈতিক বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং মনস্তত্ত্বের গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দ্রুত বিস্তার, তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি ক্রমবর্ধমান প্রশ্ন তোলার প্রবণতা এই প্রজন্মকে পূর্ববর্তী প্রজন্মের তুলনায় ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশ, নেপাল কিংবা শ্রীলঙ্কার মতো ভারতে কি Gen-Z–এর নেতৃত্বে এমন একটি গণআন্দোলন গড়ে উঠতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের পতনের কারণ হবে? সম্প্রতি দিল্লিতে ৪৯ দিনব্যাপী ছাত্র-যুব আন্দোলনের প্রেক্ষিতেও প্রশ্ন উঠেছে, ভারতেও কি Gen-Z আন্দোলন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর সরলভাবে "হ্যাঁ" বা "না" দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। বরং ভারতের সাংবিধানিক কাঠামো, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক বৈচিত্র্য, নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং গণআন্দোলনের ইতিহাসকে একত্রে বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় যে ভারতীয় বাস্তবতা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি জটিল।রাজনৈতিক বিজ্ঞানের একটি মৌলিক শিক্ষা হলো, কোনো সরকারের টিকে থাকা বা পতন কখনোই শুধু একটি আন্দোলনের ওপর নির্ভর করে না। আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং শিক্ষাবিদ  স্যামুয়েল পি হান্টিংটন তাঁর রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ সম্পর্কিত আলোচনায় দেখিয়েছিলেন যে একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে তার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা শক্তিশালী এবং বৈধ হিসেবে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য তার ওপর। যেখানে প্রতিষ্ঠান দুর্বল, সেখানে হঠাৎ গণআন্দোলন দ্রুত শাসনব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু যেখানে সংসদ, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, দলীয় কাঠামো এবং প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, সেখানে গণআন্দোলন প্রভাব বিস্তার করলেও সরকার পরিবর্তনের পথ সাধারণত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই অতিক্রম করতে হয়। ভারতের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বিশ্বের ১৪৭ কোটির বেশি মানুষের বৃহত্তম সংসদীয় গণতন্ত্র এবং একটি বিস্তৃত ফেডারেল রাষ্ট্র।

৭৯ বছরের ইতিহাসে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সরাসরি কোনো গণআন্দোলনের কারণে সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতাচ্যুত হয়নি। সরকারের অস্তিত্ব নির্ভর করে লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখার ওপর। সরকার অনাস্থা প্রস্তাবে পরাজিত হতে পারে, নির্বাচনে হেরে যেতে পারে অথবা জোটসঙ্গীদের সমর্থন হারিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে। অর্থাৎ রাস্তার আন্দোলন রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, সরকারের জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিতে পারে, নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু নিজে থেকেই সরকার অপসারণের সাংবিধানিক ক্ষমতা তার নেই। এই বাস্তবতা ভারতকে বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে আলাদা করে।বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং নেপালের উদাহরণ প্রায়ই একসঙ্গে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে তিনটি দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পটভূমি সম্পূর্ণ এক ছিল না। শ্রীলঙ্কায় গণবিক্ষোভের প্রধান কারণ ছিল নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকট। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল, জ্বালানি ও খাদ্যের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল এবং জনগণের মধ্যে সরকারের প্রতি গভীর অনাস্থা জন্মেছিল। রাজনৈতিক আন্দোলন সেখানে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের একটি বহিঃপ্রকাশ ছিল। নেপালের দীর্ঘ রাজনৈতিক রূপান্তরের পেছনে ছিল বহু বছরের গৃহযুদ্ধ, রাজতন্ত্রের অবসান, নতুন সংবিধান এবং রাজনৈতিক পুনর্গঠনের জটিল ইতিহাস। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী দেশটির নিজস্ব রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপটে ঘটেছে। ফলে এই অভিজ্ঞতাগুলোকে হুবহু ভারতের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা বিশ্লেষণগতভাবে সঠিক হবে না।

ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো এর বিশাল ভৌগোলিক ও সামাজিক বৈচিত্র্য। প্রায় প্রতিটি রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতি আলাদা, ভাষা আলাদা (সংবিধান স্বীকৃত ২২ টি ভাষা) , আঞ্চলিক পরিচয় আলাদা এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারও ভিন্ন। দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, গৌহাটি বা শ্রীনগরের রাজনৈতিক উদ্বেগ এক নয়। একটি আন্দোলন যদি কোনো একটি অঞ্চলে ব্যাপক সমর্থনও পায়, তবুও সেটিকে একই মাত্রায় সমগ্র দেশে বিস্তার করা অত্যন্ত কঠিন। বিশ্ব বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানী চার্লস টিলি এবং সিডনি ট্যারো তাঁদের সামাজিক আন্দোলন বিষয়ক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে কোনো আন্দোলনের সাফল্য কেবল অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সুযোগ, সংগঠনের ক্ষমতা, নেতৃত্ব, জোট গঠন এবং সামাজিক সমর্থনের বিস্তার সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

Gen-Z প্রজন্ম সম্পর্কে একটি প্রচলিত ধারণা হলো তারা একটি অভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। ভারতের তরুণ ভোটারদের মধ্যে আদর্শগত বৈচিত্র্য অত্যন্ত বেশি। কেউ ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থন করেন, কেউ বিরোধী দলকে, কেউ আঞ্চলিক দলকে এবং অনেকে কোনো দলের সঙ্গেই নিজেকে যুক্ত করেন না। ফলে "Gen-Z" একটি বয়সভিত্তিক পরিচয় হলেও এটি কোনো একক রাজনৈতিক পরিচয় নয়। রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, বয়সের মিল থাকলেই রাজনৈতিক আচরণ একই রকম হয় না; সামাজিক শ্রেণি, শিক্ষা, ধর্ম, ভাষা, আঞ্চলিক পরিচয়, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং পারিবারিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি একজন তরুণের রাজনৈতিক অবস্থানকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো "Relative Deprivation" বা আপেক্ষিক বঞ্চনা। মনোবিজ্ঞানী টেড রবার্ট গারের গবেষণায় বলা হয়েছে, মানুষ তখনই ব্যাপকভাবে আন্দোলনে অংশ নিতে আগ্রহী হয় যখন তারা মনে করে তাদের প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার মধ্যে একটি অসহনীয় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এটি কেবল দারিদ্র্যের প্রশ্ন নয়; বরং প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার অনুভূতি। যদি শিক্ষিত তরুণরা মনে করেন যে তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান নেই, যদি তারা বিশ্বাস করেন যে সামাজিক বা অর্থনৈতিক উন্নতির পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা কমে যায়, তাহলে প্রতিবাদের সম্ভাবনা বাড়ে। তবে এই ক্ষোভ রাজনৈতিক পরিবর্তনে রূপ নিতে হলে তা বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে হয়।

এরিকা চেনোয়েথের অহিংস গণআন্দোলন নিয়ে বহুল আলোচিত গবেষণা দেখায় যে বৃহৎ জনসম্পৃক্ত অহিংস আন্দোলন অনেক সময় সহিংস আন্দোলনের তুলনায় বেশি কার্যকর হতে পারে। তবে তিনি একই সঙ্গে দেখিয়েছেন, আন্দোলনের সাফল্য নির্ভর করে তার ব্যাপক সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, দীর্ঘস্থায়ী সংগঠন, বিভিন্ন পেশাজীবী ও সামাজিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়ার ওপর। শুধু ছাত্র বা তরুণদের অংশগ্রহণ একটি আন্দোলনকে জাতীয় রাজনৈতিক রূপান্তরের নিশ্চয়তা দেয় না। ভারতে যদি কোনো তরুণ-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন বৃহত্তর সমাজের সমর্থন না পায়, তবে সেটি রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করলেও কেন্দ্রীয় সরকারের স্থিতিশীলতাকে সরাসরি নাড়া দেওয়া কঠিন হবে।আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং লেখকজিন শার্প তাঁর অহিংস প্রতিরোধের তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন যে রাষ্ট্রের ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত জনগণের সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। জনগণ, আমলাতন্ত্র, শ্রমজীবী, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যদি সমর্থন প্রত্যাহার করে, তবে সরকার দুর্বল হতে পারে। কিন্তু ভারতের মতো একটি বৃহৎ গণতন্ত্রে এই ধরনের ব্যাপক সমন্বিত সমর্থন প্রত্যাহার সংগঠিত করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ এখানে রাজনৈতিক আনুগত্য বহুমাত্রিক এবং আঞ্চলিক বাস্তবতা অত্যন্ত শক্তিশালী।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম Gen-Z রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। টুইটার (বর্তমান X), ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, ফেসবুক এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আন্দোলনকে দ্রুত সংগঠিত করতে সাহায্য করে। কিন্তু ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেন, অনলাইনে জনপ্রিয়তা সবসময় বাস্তব জগতের সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় না। "Clicktivism" বা "Slacktivism" নামে পরিচিত ধারণা অনুযায়ী, অনেক মানুষ অনলাইনে সমর্থন জানালেও বাস্তবে আন্দোলনে অংশ নেন না। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি শক্তিশালী মাধ্যম হলেও সেটি রাজনৈতিক সংগঠনের বিকল্প নয়।ভারতের ইতিহাসও এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলন, মণ্ডল কমিশন বিরোধী আন্দোলন, দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বিরোধী আন্দোলন কিংবা কৃষক আন্দোলন—এসব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে গণআন্দোলন সরকারের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, নীতিগত পরিবর্তন আনতে পারে, এমনকি নির্বাচনী রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু সরকার পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত সংসদীয় ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হয়েছে। ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যই হলো রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রধান মাধ্যম নির্বাচন।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিভেন লেভিটস্কি এবং ড্যানিয়েল জিবল্যাট তাঁদের গণতন্ত্রবিষয়ক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে আধুনিক গণতন্ত্রে সরকার পরিবর্তনের বৈধতা মূলত নির্বাচনী ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া থেকেই আসে। গণআন্দোলন রাজনৈতিক পরিবেশকে বদলে দিতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর থাকলে চূড়ান্ত পরিবর্তন সাধারণত নির্বাচনের মাধ্যমেই ঘটে। ভারতের ক্ষেত্রে এই যুক্তি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের অযোগ্য বা গণআন্দোলন অকার্যকর। যদি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, ব্যাপক জনঅসন্তোষ, শাসক জোটের অভ্যন্তরীণ বিভাজন, বিরোধী শক্তির কার্যকর ঐক্য এবং রাষ্ট্রের প্রতি জনআস্থার উল্লেখযোগ্য অবক্ষয় একই সময়ে দেখা দেয়, তাহলে একটি বৃহৎ তরুণ-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু সেই প্রভাবও শেষ পর্যন্ত সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা, জোটের স্থায়িত্ব এবং নির্বাচনী ফলাফলের মধ্য দিয়েই বাস্তব রূপ পাবে।

মনস্তত্ত্ববিদরা আরও একটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেন, সেটি হলো "Collective Identity" বা সমষ্টিগত পরিচয়। কোনো আন্দোলন তখনই শক্তিশালী হয় যখন মানুষ নিজেদের আলাদা ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি বৃহত্তর অভিন্ন গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে দেখতে শুরু করে। ভারতের বৈচিত্র্যময় সমাজে এমন একটি সর্বভারতীয় অভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করা সহজ নয়। একই সঙ্গে "Political Efficacy" বা রাজনৈতিক কার্যকারিতার অনুভূতিও গুরুত্বপূর্ণ। যদি মানুষ বিশ্বাস করে যে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিবর্তন সম্ভব, তাহলে তারা নির্বাচন, নাগরিক উদ্যোগ ও সাংবিধানিক পথে পরিবর্তনের চেষ্টা করতে বেশি আগ্রহী হয়। যদি সেই বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন আন্দোলনের প্রবণতা বাড়তে পারে। তবে এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনও একা রাজনৈতিক রূপান্তর নিশ্চিত করে না।বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব, কিন্তু সেগুলোকে ভারতের জন্য সরাসরি ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। 

প্রতিটি দেশের ইতিহাস, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক কাঠামো এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থা আলাদা। ভারতের ক্ষেত্রে Gen-Z অবশ্যই ভবিষ্যৎ রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি, এবং তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নীতি, নির্বাচন, জনমত ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু কেবলমাত্র একটি Gen-Z আন্দোলনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের পতন ঘটবে—এমন দাবি বর্তমান রাজনৈতিক বিজ্ঞান বা মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা সমর্থন করে না। বরং গবেষণার সার্বিক ইঙ্গিত হলো, বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন সাধারণত বহু সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক উপাদানের সম্মিলিত ফল। গণআন্দোলন সেই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে, কিন্তু একমাত্র নির্ধারক নয়। একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার টিকে থাকা বা পরিবর্তিত হওয়ার প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক বৈধতা, সংসদীয় সমীকরণ এবং জনগণের নির্বাচনী রায়ের সঙ্গেই সবচেয়ে গভীরভাবে যুক্ত।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, দিল্লি

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪