স্টাফ রিপোর্টার: হাম উপসর্গ নিয়ে গত ২৩ জুলাই শিশু আফিয়াকে ভর্তি করা হয় ফরিদপুর মেডিক্যালে। গত শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাতে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। সেই রাতেই আফিয়াকে নিয়ে ঢাকার পথে রওনা হয় পরিবার। ঢাকা মেডিক্যালসহ চার হাসপাতাল ঘোরা হয় সেই রাতে। চিকিৎসা না পেয়ে রাতেই আবার ফরিদপুরে নেওয়া হয় তাকে। অবস্থার অবনতি হলে রবিবার (৯ আগস্ট) রাতে ফের ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান আফিয়া আর নেই।
শিশু আফিয়ার বয়স মাত্র ছয় মাস। বাবা মিঠুন শেখ ঢাকার একটি কার্টন ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। মা গৃহিণী। ফরিদপুরের বোয়ালমারীর বাড়িতে দুই সন্তানকে নিয়ে তাদের ছোট সংসার।
আফিয়ার পরিবার জানায়, চিকিৎসকদের পরামর্শে ৭ আগস্ট রাতে ঢাকায় নেওয়া হয় আফিয়াকে। রাত ১২টার দিকে প্রথমে আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিবারকে জানায়, সেখানে পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (পিআইসিইউ) খালি নেই। এরপর আফিয়াকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানেও পিআইসিইউতে কোনো শয্যা খালি ছিল না।
পরিবারের দাবি, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয় একটি শয্যার ব্যবস্থা করে অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়ার। হাসপাতালের এক কর্মকর্তা তাদের না করে দেন। ওই কর্মকর্তার নাম বলতে পারেননি আফিয়ার বাবা মিঠুন শেখ।
ঢামেকে ব্যবস্থা না হওয়ায় আফিয়াকে নেওয়া হয় মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে। সেখানেও পিআইসিইউ খালি ছিল না। পাশাপাশি আইসোলেশন সুবিধা না থাকায় হামের রোগী ভর্তি নেওয়া সম্ভব নয় বলে জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শেষ আশায় মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ছুটে যায় পরিবার। কিন্তু সেখানেও চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়নি বলে জানান শিশুর বাবা মিঠুন শেখ।
ঢাকার কোথাও চিকিৎসা না পেয়ে আবারও ফরিদপুর মেডিক্যালে নেওয়া হয় শিশু আফিয়াকে। সেখানে দুই দিন চিকিৎসা নিলেও রবিবার (৯ আগস্ট) রাতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। ওই রাতেই তাকে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে আসে পরিবার। কিন্তু এবার আর কোনো শয্যা, কোনো চিকিৎসা কিংবা অক্সিজেনের প্রয়োজন হলো না। বিদায় নিল আফিয়া। কর্তব্যরত চিকিৎসক আফিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঢামেক কর্তৃপক্ষ বলছে, হাম ও উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর তুলনায় সেখানে সিট সংখ্যা খুবই কম। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে মাত্র ৩২টি সিট রয়েছে হাম রোগীদের জন্য ডেডিকেটেট।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘হাম ডেডিকেটেড আমাদের মাত্র ৩২টির মতো সিট আছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করি চিকিৎসা দেওয়ার জন্য। কিন্তু সংকটময় মুহূর্ততে যদি রোগী নিয়ে আসে আমাদেরকে বলে হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য সেটা কিভাবে সম্ভব।’
আফিয়ার পরিবারের অভিযোগ তাকে অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়নি—এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢামেক পরিচালক বলেন, ‘যে রোগীর কথা বলছেন সেটা আমি জানি না স্পেসিফিক। সেটা খোঁজ নিয়ে আমাকে বলতে হবে। আর এমনটা হওয়ার কথা না। তারপরও আমি খোঁজ নিচ্ছি।’
আফিয়ার মৃত্যুর পর তার বাবা মিঠুন শেখ ঢামেকেই বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি শুধু বলছিলেন, ‘আজকে টাকার জন্য আমার মেয়েকে বাঁচাতে পারলাম না।’ পাশে বসে কাঁদছিলেন আফিয়ার মা।
মিঠুন শেখ বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে এক দিনেই ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এমন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে অসংখ্য পরিবারকে প্রতিদিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, চিকিৎসা করাবে, নাকি সংসার চালাবে।’
শিশু আফিয়ার বিষয়ে জানতে কথা হয় বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে ৭০০ বেডের মধ্যে ১০০টি আইসিইউ আছে। এগুলো সব সময় ফুল থাকে। এখানে পুরো দেশ থেকে রোগী আসে, এখন যারা ভর্তি থাকে তাদেরকে সরিয়ে নতুন কাউকে ভর্তি করা যায় না। এখন আমরা কী করব?’
হাসপাতাল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সিট রিজার্ভ করে রাখার অভিযোগের বিষয়ে জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘এমন প্রশ্নই উঠে না। আমাকে লিখিত দিতে বলেন, আমি তদন্ত করব।’
তিনি বলেন, আমরা এখানে অনেক কষ্ট করছি। আমাদের দরকার দুই হাজার বেড। আমরা চাই এখান থেকে কোনো রোগী ফিরে না যাক।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও উপসর্গে মোট ৮৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গে ৭৮০ জন ও হামে আক্রান্ত হয়ে ৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ১৫ মার্চ থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত মোট হাম রোগীর সংখ্যা এক লাখ ৩৭ হাজার ৩১২ জন। এ ছাড়া এ সময়ে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১৭ হাজার ২৭৮ জন।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব