| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

ইরানে হামলার জন্য আসা মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হাজারো সেনার জীবন সংকটে

reporter
  • আপডেট টাইম: অগাস্ট ১৪, ২০২৬ ইং | ১৫:১৩:১৬:অপরাহ্ন  |  ৮৭ বার পঠিত
ইরানে হামলার জন্য আসা মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হাজারো সেনার জীবন সংকটে

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: ইরানে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এ টানা ২৫০ দিনের বেশি সময় ধরে অবস্থান করছেন হাজারো মার্কিন সামরিক সদস্য। দীর্ঘ এই মোতায়েনের কারণে জাহাজে থাকা সেনা ও নাবিকদের জীবনযাপন নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

খাদ্য সরবরাহে সংকট, বিশুদ্ধ পানি ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সমস্যা, বিকল প্লাম্বিং, ডাক সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে রণতরীটির প্রায় পাঁচ হাজার সদস্যের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি কয়েকজন নাবিক জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন বলে মার্কিন সামরিকবিষয়ক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতারাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা পেন্টাগনের কাছে বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি এই সামরিক মোতায়েন কতটা টেকসই, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জাহাজটির পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনকে ‘ভুলভাবে উপস্থাপিত’ বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, মার্কিন নৌবাহিনী ও প্রতিরক্ষা বিভাগ মোতায়েন থাকা সেনা ও নাবিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য কাজ করছে।

মার্কিন সামরিকবিষয়ক একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনযাপন নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, চলতি মাসের শুরুতে জাহাজের এক নাবিক সাগরে পড়ে যান।

পরে একটি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে তাকে উদ্ধার করা হয় এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে ওই নাবিক কীভাবে সাগরে পড়ে গেলেন, সেটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাহাজে থাকা সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। পরিবারের সদস্যরাও দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মোতায়েন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে লেখা এক চিঠিতে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত উদ্বেগ তুলে ধরেছেন।

প্রায় পাঁচ হাজার সদস্যের এই রণতরীতে ‘মৌলিক সরবরাহের সংকট, দূষিত পানি, প্লাম্বিং ত্রুটি, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, ডেক নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ডাক ব্যবস্থার ব্যাঘাত’-এর অভিযোগের কথা চিঠিতে উল্লেখ করেন তিনি।

ব্লুমেনথালের মতে, এসব অভিযোগ অবিলম্বে গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনী এ ধরনের দীর্ঘ ও উচ্চমাত্রার অপারেশনাল চাপ কতটা টেকসইভাবে বহন করতে পারছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর রুবেন গ্যালেগোও জাহাজটির ‘ভয়াবহ পরিস্থিতি’ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। এ জন্য কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধিদলকে সরাসরি জাহাজে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান মাইকেল লেভিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের জীবনযাত্রার বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন।

তার দাবি, জাহাজে ছত্রাকধরা গোসলখানা, বিকল টয়লেট, সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাপড় ধোয়ার সুযোগ না থাকা, দীর্ঘ সময় গরম পানি না পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসামগ্রীর ঘাটতির মতো সমস্যা রয়েছে।

জাহাজে থাকা এক নাবিকের এক আত্মীয়ও বিবিসির কাছে দীর্ঘ মোতায়েনের প্রভাবের কথা জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, ওই নাবিকের ওজন প্রায় ৬৫ পাউন্ড বা ২৯ কেজি কমে গেছে।

ওই আত্মীয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন বন্দরে ভিড়তে না পারা, জাহাজ থেকে নামার সুযোগ না থাকা, সার্বক্ষণিক কম্পন ও শব্দ, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং সতেজ খাবারের সংকট নাবিকদের ওপর ব্যাপক মানসিক চাপ তৈরি করছে।

ওই নাবিক তার আত্মীয়কে লিখেছেন, ‘আমি মৃতপ্রায় ক্লান্ত। একেবারে মৃত।’

তবে মার্কিন নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা এসব অভিযোগের বড় অংশ খণ্ডন করেছেন। বিবিসিকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, জাহাজে আত্মহত্যার চিন্তা বা আত্মহত্যাচেষ্টার ঘটনা বেড়েছে—এমন কোনো তথ্য নৌবাহিনীর কাছে নেই।

তার দাবি, যুদ্ধকালীন তৎপরতার কারণে নিয়মিত সরবরাহব্যবস্থা কিছুটা ব্যাহত হলেও বর্তমানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সরবরাহ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। প্রথমে খাদ্য, এরপর স্বাস্থ্যসামগ্রী এবং পরে ডাক পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বর্তমানে জাহাজে বিশুদ্ধ পানি, সচল শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং পুষ্টিকর খাবারের ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার পানামায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তিনি বলেন, সরকার চেষ্টা করছে যেন ‘প্রতিটি জাহাজ, প্রতিটি ক্রু ও প্রতিটি ক্যাপ্টেন’ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা পায়।

কিছু সামরিক মোতায়েন অন্যগুলোর তুলনায় দীর্ঘ হতে পারে উল্লেখ করে নাবিকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

ট্রাম্প প্রশাসনের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলসও বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ—দুজনই মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় রসদ ও সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন গত বছরের নভেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়ে দক্ষিণ চীন সাগরের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। পরে ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলার আগে রণতরীটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়।

মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, মে মাসে রণতরীটির যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে একাধিকবার এর মোতায়েনের সময় বাড়ানো হয়। এরপর আর নির্দিষ্ট করে ফেরার তারিখ জানানো হয়নি।

এই দীর্ঘ মোতায়েনের মধ্যে রণতরী থেকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে জাহাজের সদস্যদের ওপর অপারেশনাল চাপ যে দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত রয়েছে, তা নিয়ে মার্কিন সামরিক মহলে আলোচনা চলছে।

তবে গত বৃহস্পতিবার একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পূর্বনির্ধারিত রোটেশন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের পরিবর্তে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছে।

দীর্ঘমেয়াদি সামরিক মোতায়েনের সময় নৌবাহিনীর সদস্যদের মানসিক চাপ কমাতে অতীতে বিভিন্ন বিনোদনমূলক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। সামরিক প্রকাশনা স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস জানিয়েছে, নৌসদস্যদের জন্য বিঙ্গো, আর্ট সেশন ও সংগীত প্রতিযোগিতার মতো কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর পরিচালিত একটি সমীক্ষাতেও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে আসে। সেখানে দেখা যায়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যান্য শাখার তুলনায় নৌবাহিনীর জাহাজে থাকা সদস্যদের মধ্যে ‘তীব্র মানসিক সংকট’-এর হার বেশি।

সমীক্ষায় অনুপযুক্ত আবাসন, ক্রমাগত শব্দ, পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের অভাবকে মানসিক চাপের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এ ছাড়া সামরিক তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক প্রকাশনা ইউএসএনআই নিউজ-এর তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনী ও মেরিন কোরে মৃত্যুর বড় কারণগুলোর একটি এখনো আত্মহত্যা।

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে মোতায়েন থাকা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের প্রায় পাঁচ হাজার সদস্যের জীবনযাপন ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি এখন মার্কিন প্রশাসন ও কংগ্রেসের নজরে এসেছে। একদিকে যুদ্ধ ও সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় জাহাজে আটকে থাকার চাপ—দুইয়ের মধ্যে মার্কিন নৌসেনাদের ওপর কতটা চাপ পড়ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।


সূত্র: বিবিসি বাংলা


রিপোর্টার্স২৪/ঝুম

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪