রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রত্যাশিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশমালার খসড়া প্রায় চূড়ান্ত হওয়ার পর শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের বেতন-ভাতা নিয়ে নতুন জটিলতা দেখা দিয়েছে। ফলে গেজেট প্রকাশের আগেই পুরো বিষয়টি আরও এক দফা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জুডিশিয়াল সার্ভিসের অধীন বিচারকরা মূল বেতনের সমপরিমাণ বা শতভাগ ভাতা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে জুডিশিয়াল সার্ভিসের বেতন-ভাতার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে গেজেট প্রকাশের আগে আরও বিস্তারিত পর্যালোচনার নির্দেশনা এসেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে।
এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন-২০২৫-এর প্রতিবেদন এবং এর সুপারিশগুলো নিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ের পর্যালোচনা শুরু করতে যাচ্ছে অর্থ বিভাগ। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে কোনো বৈষম্য, অসঙ্গতি কিংবা আর্থিক চাপ তৈরি হবে কি না, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হবে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী এক অনির্ধারিত বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে নবম পে-স্কেলের আর্থিক প্রভাব, বাস্তবায়নের সম্ভাব্য সময়সূচি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোর মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা করেন।
বৈঠকে জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন এবং জুডিশিয়াল সার্ভিসের পক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবিগুলো আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বেতন কাঠামোর কোথাও কোনো বৈষম্য বা অসঙ্গতি থাকলে তা দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শুধু বেতন কাঠামোর অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য নয়, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের বর্তমান আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, চলমান আর্থিক সংকট এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর নতুন বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এসব কারণে পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময়সূচি আরও কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া যায় কি না, তা নিয়েও সরকারের ভেতরে আলোচনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত সাত সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি শিগগিরই বৈঠকে বসবে। এই বৈঠকে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন উপস্থাপন এবং গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে গত ১২ আগস্ট এ কমিটির বৈঠক আহ্বান করা হলেও সদস্যদের অনুপস্থিতির কারণে তা অনুষ্ঠিত হয়নি। নতুন বৈঠকে বিচারকদের বেতন-ভাতা, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা এবং প্রস্তাবিত নতুন কাঠামোর আর্থিক প্রভাব বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
বিশেষ করে বিচারকদের বর্তমান বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা দেশের সামগ্রিক আর্থিক বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত কত অর্থের প্রয়োজন হবে এবং সেই অর্থ কোন পদ্ধতিতে জোগান দেওয়া সম্ভব এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
তবে এর মধ্যেই জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে সচিব কমিটির প্রক্রিয়া অনেকটাই এগিয়ে গেছে। সর্বশেষ ১২ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন সচিব কমিটি জাতীয় বেতন কমিশন, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটির সুপারিশ পর্যালোচনা করে নতুন প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে।
সচিব কমিটির প্রস্তাবে গ্রেডভেদে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামো একবারে পুরোপুরি বাস্তবায়নের পরিবর্তে দুই ধাপে কার্যকর করার প্রস্তাবও রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে মূল বেতন বাড়ানো এবং পরবর্তী বছরে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
ফলে একদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন পে-স্কেল দ্রুত বাস্তবায়নের প্রত্যাশা তৈরি হলেও অন্যদিকে জুডিশিয়াল সার্ভিসের বেতন-ভাতার দাবি, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আরও সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
এখন অর্থ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কমিটির পর্যালোচনার পরই স্পষ্ট হবে—প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেল নির্ধারিত সময়েই গেজেট আকারে প্রকাশ হবে, নাকি নতুন জটিলতার কারণে এর বাস্তবায়ন আরও পিছিয়ে যাবে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম