| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার সেই ভয়াল দিন আজ

reporter
  • আপডেট টাইম: অগাস্ট ১৭, ২০২৬ ইং | ১১:১৬:৩০:পূর্বাহ্ন  |  ২৫০৮ বার পঠিত
দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার সেই ভয়াল দিন আজ

রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: আজ ১৭ আগস্ট। বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহ এক জঙ্গি হামলার কালো অধ্যায়ের দিন। ২০০৫ সালের এই দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের ৬৩ জেলার প্রায় সাড়ে ৪০০ স্থানে একযোগে সিরিজ বোমা হামলা চালানো হয়। আদালত, বিমানবন্দর, মার্কিন দূতাবাস থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কার্যালয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনা ছিল হামলার লক্ষ্য।

সেদিন নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) পরিকল্পিতভাবে দেশের ৬৩ জেলায় একই সময়ে সিরিজ বোমা হামলা চালায়। মুন্সীগঞ্জ ছাড়া দেশের প্রায় সব জেলায় সংঘটিত ওই হামলায় দুজন নিহত এবং অন্তত ১০৪ জন আহত হন। একযোগে এত বিপুলসংখ্যক স্থানে বোমা হামলার ঘটনায় মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একের পর এক বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটতে থাকে। একই সময়ে দেশের এতগুলো স্থানে বিস্ফোরণের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। হামলাকারীদের উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও বিচারব্যবস্থাকে ভয় দেখানো এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা।

পুলিশ সদর দপ্তর ও র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পরপরই সারাদেশে মোট ১৫৯টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) ১৮টি, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশে (সিএমপি) ৮টি, রাজশাহী মহানগর পুলিশে (আরএমপি) ৪টি, খুলনা মহানগর পুলিশে (কেএমপি) ৩টি, বরিশাল মহানগর পুলিশে (বিএমপি) ১২টি এবং সিলেট মহানগর পুলিশে (এসএমপি) ১০টি মামলা করা হয়।

এ ছাড়া ঢাকা রেঞ্জে ২৩টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১১টি, রাজশাহী রেঞ্জে ৭টি, খুলনা রেঞ্জে ২৩টি, বরিশাল রেঞ্জে ৭টি, সিলেট রেঞ্জে ১৬টি, রংপুর রেঞ্জে ৮টি, ময়মনসিংহ রেঞ্জে ৬টি এবং রেলওয়ে রেঞ্জে ৩টি মামলা দায়ের করা হয়।

পুলিশ ও র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা ১৫৯টি মামলার মধ্যে ১৪২টি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। বাকি ১৭টি মামলায় ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলেও আসামিদের শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

এসব মামলায় মোট ৯৬১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১ হাজার ৭২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।

পুলিশের দেওয়া তথ্য বলছে, ১৫৯টি মামলার মধ্যে ৯৪টির বিচার ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এসব মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে ৩৩৪ জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৫৫টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ৩৮৬ জন।

সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় রায় দেওয়া মামলাগুলোতে ৩৪৯ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আসামিদের মধ্যে ২৭ জনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। এর মধ্যে আটজনের ফাঁসি ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে। এসব মামলায় ৩৫৮ জন খালাস পেয়েছেন এবং ১৩৩ জন আসামি জামিনে রয়েছেন। ঢাকায় বিচারাধীন পাঁচটি মামলা বর্তমানে সাক্ষ্য গ্রহণের শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

দেশে জঙ্গি তৎপরতার ভয়াবহতার অন্যতম নজির ছিল বিচারকদের ওপর ধারাবাহিক হামলা। ঝালকাঠিতে দুই বিচারককে হত্যার ঘটনায় ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ ছয় জঙ্গি নেতার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

ফাঁসি দেওয়া ছয়জন হলেন, জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান, তাঁর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, সামরিক কমান্ডার আতাউর রহমান সানি, চিন্তাবিদ আব্দুল আউয়াল, খালেদ সাইফুল্লাহ এবং সালাউদ্দিন।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক জঙ্গি হামলা চলতে থাকে। এসব হামলায় বিচারক ও আইনজীবীসহ অন্তত ৩০ জন নিহত এবং চার শতাধিক মানুষ আহত হন।

২০০৫ সালের ৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরের আদালতে জঙ্গিরা বোমা হামলা চালায়। এসব হামলায় তিনজন নিহত এবং বিচারকসহ অন্তত ৫০ জন আহত হন।

এর কয়েকদিন পর সিলেটে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক বিপ্লব গোস্বামীর ওপর বোমা হামলা চালানো হয়। এতে বিচারক ও তাঁর গাড়িচালক আহত হন।

এরপর ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে বিচারক বহনকারী গাড়ি লক্ষ্য করে আত্মঘাতী জঙ্গিরা বোমা হামলা চালায়। ওই হামলায় ঝালকাঠি জেলা জজ আদালতের বিচারক জগন্নাথ পাড়ে এবং সোহেল আহম্মদ নিহত হন। হামলায় আরও অনেক মানুষ আহত হন।

জঙ্গিদের ধারাবাহিক হামলায় দেশের বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়। একই সঙ্গে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও জোরদার করা হয়।

২০০৫ সালের সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলাগুলোর অন্যতম ঘটনা ঘটে ২৯ নভেম্বর। একই দিনে গাজীপুর বার সমিতির লাইব্রেরি এবং চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়।

গাজীপুর বার সমিতির লাইব্রেরিতে আইনজীবীর পোশাকে প্রবেশ করে এক আত্মঘাতী জঙ্গি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। ভয়াবহ ওই হামলায় আইনজীবীসহ ১০ জন নিহত হন। বিস্ফোরণে হামলাকারী জঙ্গিও নিহত হয়।

একই দিনে চট্টগ্রাম আদালত চত্বরে জেএমবির আত্মঘাতী জঙ্গিরা বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে রাজীব বড়ুয়া নামের এক পুলিশ কনস্টেবল এবং একজন সাধারণ মানুষ নিহত হন। পুলিশ সদস্যসহ প্রায় অর্ধশত মানুষ ওই হামলায় আহত হন।

২৯ নভেম্বরের হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই একই বছরের ১ ডিসেম্বর গাজীপুর জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ের গেটে আবারও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় গাজীপুরের কৃষি কর্মকর্তা আবুল কাশেম নিহত হন। বিস্ফোরণে কমপক্ষে ৪০ জন আহত হন।

এর এক সপ্তাহ পর ৮ ডিসেম্বর নেত্রকোনায় ঘটে আরও ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা। নেত্রকোনা শহরের বড় পুকুরপাড় এলাকায় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়ের সামনে আত্মঘাতী জঙ্গিরা বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়।

ওই হামলায় স্থানীয় উদীচীর দুই নেতাসহ আটজন নিহত হন। আহত হন শতাধিক মানুষ। এই হামলার মধ্য দিয়ে জঙ্গিরা যে শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা বিচারব্যবস্থাকেই লক্ষ্য করেছিল তা নয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিসরেও আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল এমনটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে জঙ্গিবাদের বিস্তারের এক ভয়াবহ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। একযোগে দেশের ৬৩ জেলায় বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে জঙ্গিরা তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও ভয়াবহতার জানান দিয়েছিল। এরপর কয়েক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে তারা বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।

সেই ভয়াল ১৭ আগস্টের দুই দশক পরও দিনটি প্রতিবছরই ফিরে আসে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সমাজের অবস্থানকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিতে। একই সঙ্গে ওই হামলায় নিহত ও আহতদের স্মরণ এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির প্রয়োজনীয়তাও সামনে নিয়ে আসে এই দিনটি।


রিপোর্টার্স২৪/ঝুম

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪