| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

ঠাকুরগাঁওয়ে সংঘাত-সংঘর্ষ চাই না, সহিষ্ণুতার রাজনীতি করতে হবে: রাষ্ট্রপতি

reporter
  • আপডেট টাইম: সেপ্টেম্বর ০৬, ২০২৬ ইং | ১৯:০৬:৩৩:অপরাহ্ন  |  ১৫৯ বার পঠিত
ঠাকুরগাঁওয়ে সংঘাত-সংঘর্ষ চাই না, সহিষ্ণুতার রাজনীতি করতে হবে: রাষ্ট্রপতি

রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো ধরনের সংঘাত-সংঘর্ষ চান না বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সব রাজনৈতিক দলকে নিজ নিজ মতাদর্শ ও রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রচারের পাশাপাশি সংঘাতে না জড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় বড় মাঠে নাগরিক কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমরা ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো সংঘাত, কোনো সংঘর্ষ চাই না। সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে বলবো—আপনারা নিজেদের রাজনীতি করবেন, মতবাদ প্রচার করবেন, কিন্তু সংঘাতে কখনো জড়াবেন না।’

ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় এসে জনগণের সামনে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেসব দাবির মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি ছিল অন্যতম। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি নির্ধারণ ও অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে এবং ভাইস চ্যান্সেলরও দায়িত্ব নিয়েছেন। এখন শিক্ষক নিয়োগের কার্যক্রম সামনে রয়েছে। আগামীকাল (সোমবার) এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে। এর ফলে ঠাকুরগাঁওয়ের ছেলেমেয়েরা নিজ এলাকায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবে।

মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে মেডিকেল কলেজের দাবিও ছিল। সেই দাবি বাস্তবায়িত হয়েছে এবং এর জন্য জায়গাও নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী বছর থেকে সেখানে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ভূল্লী ও রুহিয়াকে পৃথক উপজেলা করার দাবিও ছিল ঠাকুরগাঁওবাসীর। এরই মধ্যে দুটিই উপজেলা হয়েছে। ইউএনও যোগ দিয়েছেন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালুর বিষয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিমানবন্দর চেয়েছিলেন ঠাকুরগাঁওবাসী। তাদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি বিমানবন্দর চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন।

তবে বিমানবন্দর চালু করলেই সাধারণ মানুষ খুব বেশি উপকৃত হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কিন্তু বিমানবন্দর চালু ও ভবিষ্যতে তা সচল রাখতে হলে ঠাকুরগাঁওয়ে কলকারখানা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে বর্তমানে কলকারখানা, ফ্যাক্টরি ও ইন্ডাস্ট্রির সংখ্যা খুবই কম। ফলে মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে সরকার কাজ করছে।

তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই অর্থমন্ত্রীকে ঠাকুরগাঁওয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল। তিনি পুরো এলাকা পরিদর্শনের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। বাণিজ্যমন্ত্রীও ঠাকুরগাঁওয়ে এসে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেছেন। খুব শিগগিরই কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে কিছু বিনিয়োগকারীকে ঠাকুরগাঁওয়ে নিয়ে আসা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়নে চীনের সহযোগিতার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, সম্প্রতি চীনের রাষ্ট্রদূতকে ঠাকুরগাঁওয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল। তিনি এই স্টেডিয়ামে প্রায় ছয় হাজার শিশুকে স্কুলব্যাগ দিয়েছেন।

এ ছাড়া কিছুদিন আগে ঠাকুরগাঁওয়ের ১০ জন ছাত্র ও পাঁচজন শিক্ষককে চীনে ঘুরিয়ে দেখানো হয়েছে। ভবিষ্যতে ঠাকুরগাঁওয়ে কলকারখানা স্থাপনের বিষয়ে সহযোগিতা করতে চীন থেকে বিশেষজ্ঞরাও আসবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

রাজনৈতিক সহনশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ সাধারণত শান্তিপ্রিয়। এ জেলায় মামলা-মোকদ্দমাও তুলনামূলক কম হয়। মানুষ নির্ঝঞ্ঝাটে থাকতে চায় এবং এই পরিবেশ ধরে রাখতে হবে।

তিনি বলেন, অতীতে ঠাকুরগাঁওয়ের গণতন্ত্রকামী মানুষের ওপর নির্যাতন হয়েছে। অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং শ্রমিক-কৃষকদের বিরুদ্ধে শত শত, হাজার হাজার মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর অশেষ রহমতে সেই সময় পার হয়ে এসেছে দেশ।

রাষ্ট্রপতি বলেন, আমরা অনেক ত্যাগ ও রক্তপাতের বিনিময়ে আজ এখানে এসেছি। কিছুক্ষণ আগে দেখলেন, কয়েকজন মহিলা এসে সহযোগিতা নিয়ে গেলেন, তাদের সকলেরই সন্তান এই সংগ্রামে নিহত হয়েছে। এ রকম মৃত্যু, এই রক্তপাত আমরা আর দেখতে চাই না।

তিনি বলেন, যে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করা হয়েছে, সেই গণতন্ত্র রক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে সমঝোতার রাজনীতি দেখতে চান তিনি। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানের মধ্যে কোনো বিভেদ নয়; সবাই যেন একজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে নিজেদের অধিকার নিয়ে বসবাস করতে পারেন এমন সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।

মঞ্চে উপস্থিত দুই রাজনৈতিক নেতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, লালমনিরহাটের নেতা দুলু সাহেব সেখানে চমৎকার পরিবেশ তৈরি করেছেন। পাশের জেলার মন্ত্রী ফরহাদ আজাদও পঞ্চগড়কে একটি আলোকিত জেলা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, আমার অনুরোধ থাকবে, কোনো হানাহানি নয়, আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়েই আমরা রাজনীতি করব। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সহিষ্ণুতা। মন্ত্রী থাকাকালে ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়নে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি যখন মন্ত্রী ছিলেন, তখন জেলার মাদরাসা ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৭২ কোটি টাকার সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, ঠাকুরগাঁওয়ে একটি স্পোর্টস ভিলেজ তৈরি করা হবে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নতুন খেলার মাঠ নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া জেলায় আধুনিক তথ্য কমপ্লেক্স, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কার্যালয়, সমবায় প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং পীরগঞ্জে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকা ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরও চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। কৃষি উন্নয়নের প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, বরেন্দ্র মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্সের মাধ্যমে ঠাকুরগাঁওয়ে কৃষির উন্নয়নে কাজ করা হয়েছে। পাশাপাশি গোবিন্দপুরের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ঠাকুরগাঁও পলিটেকনিক নতুন করে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।

প্রবাসে কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, মালয়েশিয়া থেকে প্রায় ১০ হাজার কর্মী নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ বিনা খরচে যাওয়ার সুযোগ পাবেন বলে জানান তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফের সঙ্গে তার এ বিষয়ে কথা হয়েছে এবং ঠাকুরগাঁও থেকেই এই কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শুধু চাকরি বা ঠিকাদারির পেছনে না ছুটে নিজেদের কর্মসংস্থান নিজেরাই তৈরির চেষ্টা করতে হবে। ব্যবসায়ীদেরও আরও বেশি বিনিয়োগের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তরুণ সমাজকে মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, মাদক বর্জন করতে হবে। লালমনিরহাটের মতো ঠাকুরগাঁওকেও মাদকমুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কাজ শুরু করতে হবে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসককে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্য সংসদ সদস্যদেরও এ কাজে যুক্ত হতে বলা হবে।

জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, কিছুক্ষণ আগে দুলু সাহেবের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি প্রথমে দুঃখ পেয়েছিলেন, পরে খুশি হয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তাকে বলেছেন, এমন জায়গায় তাকে পাঠানো হয়েছে, যেখানে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ আগের তুলনায় কমে গেছে।

তবে ঠাকুরগাঁওবাসীকে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে। চিঠি দিয়ে জানালে তিনি যথাসাধ্য সবার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করবেন।

তিনি বলেন, ‘মনে করবেন না যে আমি আপনাদের কাছ থেকে দূরে চলে গেছি। আমি সব সময় আপনাদের সঙ্গে ছিলাম, আপনাদের সঙ্গেই থাকবো।’

নিজের শৈশব ও শিক্ষাজীবনের স্মৃতিচারণ করে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল বলেন, তার জন্ম ঠাকুরগাঁওয়ে এবং এখানেই তার শৈশব ও স্কুলজীবন কেটেছে। তার শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তারা তাকে মানুষ করেছেন।

তিনি রুস্তম আলী স্যার ও খান ইউসুফ স্যারের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেন। তাদের কাছ থেকেই সততা, নেতৃত্ব ও জীবনে চলার শিক্ষা পেয়েছেন বলে জানান তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষের মধ্যে ঐক্য ও ভালোবাসা থাকবে। ৫ আগস্টের পর দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দেওয়া একটি বিবৃতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তপাতের পর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একটি সুযোগ এসেছে। তাই সংঘাত ও প্রতিশোধের পরিবর্তে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সবাই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।

নাগরিক সংবর্ধনায় ঠাকুরগাঁওবাসীর ভালোবাসায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, আজ আপনারা আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, তা আমি কখনোই শোধ করতে পারবো না। আমি মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে শুকরিয়া আদায় করি যে, তিনি আমাকে আজ এমন একটা জায়গায় নিয়ে এসেছেন, যেখানে আমি আপনাদের জন্য কাজ করতে পারব।

তিনি বলেন, আল্লাহ যেন তাকে এমন তৌফিক দেন, যাতে জীবনের বিনিময়ে হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা, অধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য কাজ করে যেতে পারেন।

পরিশেষে ঠাকুরগাঁওবাসীর শান্তি, সুখ, সমৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্য কামনা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক।


রিপোর্টার্স২৪/ঝুম

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪