রাবি প্রতিনিধি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) নীতিনির্ধারণী গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম সিনেট। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী নিয়মিত সিনেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও ২০১৬ সালের পর থেকে প্রায় এক দশক ধরে কোনো অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়নি। দীর্ঘ এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চলমান থাকলেও সিনেটের নিয়মিত কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে আছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ সিনেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালের ১৯ মে। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত আর কোনো বার্ষিক সিনেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়নি। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী বাজেটসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সিনেটের ভূমিকা রয়েছে।
এদিকে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২০২৫ সালে রাকসু ও সিনেট শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও নির্বাচিত পাঁচ শিক্ষার্থী প্রতিনিধি এখনো শপথ নেননি। ফলে একদিকে দীর্ঘদিন ধরে সিনেটের অধিবেশন হচ্ছে না, অন্যদিকে নির্বাচিত শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরাও সিনেটের কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না।
সিনেট ছাড়াই কীভাবে চলছে গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম?
২০১৬ সালের পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক নতুন বিভাগ ও একাডেমিক কার্যক্রম চালু হয়েছে। পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, বাজেট প্রণয়নসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
তবে এসব সিদ্ধান্তের কোনগুলো সিনেটের আলোচনা বা অনুমোদনের আওতাভুক্ত এবং কোনগুলো সিনেট ছাড়াই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারে নেওয়া যায়—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দীর্ঘদিন সিনেটের অধিবেশন না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, আমার খুবই ইচ্ছা আছে সিনেট শুরু করার। গত ১৭ মাস যারা দায়িত্বে ছিলেন, তারা সিনেটের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন কিনা এই প্রশ্নটি আগে করা উচিত। আমি সিনেট করব বলে আশা রাখি। সিনেটের বিষয়ে অলরেডি কাজ শুরু করেছি, খুব শীঘ্রই আপনারা তা দেখতে পাবেন।
আইন কী বলছে?
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ,৭৩ক অনুযায়ী সিনেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণ ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিনেটের ভূমিকা নির্ধারিত রয়েছে। আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর সিনেটের বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার বিধানও রয়েছে।
কিন্তু প্রায় এক দশক ধরে সিনেটের কোনো অধিবেশন না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, আইন অনুযায়ী নির্ধারিত এই কার্যক্রম নিয়মিত হচ্ছে না কেন। একই সঙ্গে সিনেটের সভা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী কাঠামো ও জবাবদিহির ওপর এর কী ধরনের প্রভাব পড়ে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও এখনো শপথ নেননি
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২০২৫ সালে রাকসু ও সিনেট শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে পাঁচজন শিক্ষার্থী সিনেট প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন। তবে নির্বাচন হওয়ার প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো তাদের শপথ অনুষ্ঠিত হয়নি।
ফলে শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সিনেটের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ না পাওয়ায় তাদের প্রতিনিধিত্বের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রাকসু ভিপি ও সিনেট সদস্য মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “সিনেট বাস্তবায়নের বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যেই মাননীয় উপাচার্য মহোদয় ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে একাধিকবার আমাদের দাবি তুলে ধরেছি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এ নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো গুরুত্ব বা কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।”
তিনি বলেন, একেবারে বছর পার হতে চললো, অথচ এখনও পর্যন্ত সিনেট কার্যকর না হওয়াটা অত্যন্ত দুঃখজনক। যেখানে অন্যান্য ক্যাম্পাসে সিনেট সদস্য নির্বাচন বা সিলেকশন প্রক্রিয়ায় হয়, সেখানে আমাদের ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেছে। শিক্ষার্থীদের সেই ম্যান্ডেট থাকা সত্ত্বেও সিনেট বাস্তবায়নে প্রশাসনের এই গড়িমসি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
তিনি আরও বলেন, সিনেট বাস্তবায়ন হলে প্রশাসনের কী ধরনের ক্ষতি হবে, তা আমাদের বোধগম্য নয়। হয়তো তাদের অভ্যন্তরীণ এমন অনেক সংকট বা সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা ঢাকতেই তারা সিনেট গঠনে অনীহা প্রকাশ করছে। তবে যা-ই হোক না কেন, এসব অহেতুক অজুহাতে সিনেট আটকে রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
প্রশাসন সিনেট কার্যকর করতে চায় না
সিনেট সদস্য সালমান সাব্বির বলেন, সিনেট নির্বাচনের পর আমরা পাঁচজন ছাত্র প্রতিনিধি একাধিকবার বর্তমান ও সাবেক উপাচার্য (ভিসি) মহোদয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। এতদিন প্রশাসনের অজুহাত ছিল যে ছাত্র প্রতিনিধি না থাকার কারণে সিনেট কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু আমরা যখন সিনেট কার্যকর করার প্রস্তাব নিয়ে গেলাম, তখন সঙ্গত কারণেই তারা এ বিষয়ে কোনো আগ্রহ প্রকাশ করেননি।
তিনি বলেন, সোজা কথায় বলতে গেলে, প্রশাসন আসলে সিনেট কার্যকর করতে চায় না। মুখে বললেও সিনেট অধিবেশন ডাকার এখতিয়ার মাননীয় উপাচার্যের। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
সালমান সাব্বিরের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা ও সিদ্ধান্তগুলো সিনেট থেকে পাস হওয়ার কথা, যা বর্তমানে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সহজেই পাস করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যেমন উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনেটের মাধ্যমে নির্বাচিত তিনজনের প্যানেল থেকে উপাচার্য নিয়োগ হওয়ার নিয়ম থাকলেও সিনেট অকার্যকর রেখে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সিনেট কার্যকর হলে প্রশাসনের একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা দেখানোর এবং নিজেদের কোরাম মেইনটেইন করে সিদ্ধান্ত পাস করানোর সুযোগ থাকবে না বলেই তাদের এই অনিচ্ছা।
সালমান সাব্বির বলেন, সম্প্রতি উপাচার্য স্যারের সঙ্গে কথা হলে তিনি উল্টো আমাদেরকেই খোঁজখবর নিতে বলেছেন যে কতজন সদস্য আছেন বা নেই। কাজটি প্রশাসনের হলেও সিনেট সদস্য হিসেবে আমরা দায়িত্ব পালন করতে চেয়েছি। আমরা স্পষ্ট করে জানিয়েছি যে আমাদের মেয়াদ থাকাকালীন অবশ্যই সিনেট অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। সিনেট সদস্যদের নির্দিষ্ট মেয়াদ না থাকায় পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত আমরা সিনেট কার্যকর করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাব।
তাহলে সিনেট কবে কার্যকর হবে?
প্রায় এক দশক ধরে সিনেটের অধিবেশন না হওয়া এবং ২০২৫ সালে নির্বাচিত পাঁচ শিক্ষার্থী প্রতিনিধির এখনো শপথ না হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী সিনেটের নিয়মিত কার্যক্রম কবে পুনরায় চালু হবে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাবেন এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
দীর্ঘদিন সিনেটের অধিবেশন না হওয়া শুধু একটি প্রশাসনিক ঘাটতি, নাকি এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণ, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার বৃহত্তর প্রশ্ন জড়িয়ে আছে—তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। তবে প্রায় এক দশক ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সিনেটের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের স্পষ্ট অবস্থান ও সময়সীমা জানানো জরুরি বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম