| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

আইএমএফ–বিশ্বব্যাংকের

ঋণ ও বিনিয়োগে নতুন পথের বার্তা, আশায় বাংলাদেশ

reporter
  • আপডেট টাইম: অক্টোবর ২২, ২০২৬ ইং | ১৪:৫৩:৫৩:অপরাহ্ন  |  ৮৭৮ বার পঠিত
ঋণ ও বিনিয়োগে নতুন পথের বার্তা, আশায় বাংলাদেশ

সোমনাথ দে, ব্যাংকক(থাইল্যান্ড) থেকে: যুদ্ধের অভিঘাত, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি, ঊর্ধ্বমুখী ঋণের ব্যয় এবং দুর্বল প্রবৃদ্ধির চাপ মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে শেষ হয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলন। সম্মেলনের সমাপনী বার্তায় আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, ঋণঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নতুন করে আইএমএফের প্রায় ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা এবং বিশ্বব্যাংকের বাড়তি অর্থায়ন পাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।

১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে বিশ্বের ১৯১টি সদস্যদেশের প্রতিনিধি, অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ও উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন। ১৭ অক্টোবর আইএমএফের আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও আর্থিক কমিটির (আইএমএফসি) বৈঠকের পর প্রকাশিত বক্তব্যে বলা হয়, যুদ্ধ ও সংঘাতের বিস্তার, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও বাণিজ্যপথে বিঘ্ন এবং জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। স্বল্পমেয়াদি অর্থায়ন সংকটে থাকা, কিন্তু টেকসই ঋণ পরিস্থিতি ও সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা রয়েছে। এমন দেশগুলোকে সহায়তা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়।

সমাপনী বার্তায় দেশগুলোকে মধ্যমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিয়ে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা, বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে প্রবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকেও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়েছে। 

আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির সহনশীলতা থাকলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণ, জলবায়ু ঝুঁকি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার বক্তব্যেও উন্নয়নের কেন্দ্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সরকারি অর্থের সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য কী সম্ভাবনা

বাংলাদেশের জন্য সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি নতুন আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আইএমএফের বৈঠকে নীতিগত বিষয়গুলোতে অগ্রগতি হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে দুই পক্ষের দল বসে বাকি বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে চূড়ান্ত করার কথা। এর পর কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ প্রায় ৪৫০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ সহায়তা চাইছে। এ ঋণের পরিমাণ, শর্ত ও কিস্তি নিয়ে আলোচনা এখনো চলমান। সরকারের আশা, চলতি বছরের শেষ নাগাদ চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে। তবে অর্থ ছাড়ের আগে ঋণদাতার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন এবং কর্মসূচির শর্ত চূড়ান্ত হওয়া প্রয়োজন। রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংক খাতের সংস্কার, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ব্যবস্থাপনা এবং ভর্তুকি নীতির মতো বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকেও বড় অঙ্কের সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। নিয়মিত সহায়তার বাইরে আগামী তিন বছরে অতিরিক্ত ১০০০ কোটি ডলার অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। জ্বালানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ সামলানোসহ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এ অর্থ ব্যবহারের লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়ন অগ্রাধিকার নির্ধারণে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে নতুন কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক (সিপিএফ) চুক্তি চূড়ান্ত করার উদ্যোগ চলছে। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে অতিরিক্ত ১০০০ কোটি ডলারের বিষয়েটি এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে, প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের কর্মসূচিতে সহায়তা দিতে আগ্রহী। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বৈদেশিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তার মধ্যে এই সহযোগিতা অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে পারে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং বেসরকারি বিনিয়োগে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আশার পাশাপাশি শর্তও রয়েছে

সম্মেলনের বার্তা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হলেও সম্ভাব্য অর্থায়নকে নিশ্চিত অর্থ বলা যাবে না। আইএমএফের ঋণ পেতে সংস্কার কর্মসূচি ও শর্তে সমঝোতা প্রয়োজন; বিশ্বব্যাংকের বাড়তি অর্থায়নের ক্ষেত্রেও প্রকল্প, নীতিগত অগ্রাধিকার এবং অর্থ ছাড়ের কাঠামো চূড়ান্ত করতে হবে। ঋণ নিয়ে সাময়িকভাবে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সামলানো সম্ভব হলেও রাজস্ব আয় না বাড়লে এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর না হলে দীর্ঘমেয়াদি সংকট কাটবে না।

সব মিলিয়ে ব্যাংকক সম্মেলন বাংলাদেশের সামনে নতুন অর্থায়ন ও উন্নয়ন সহযোগিতার দরজা খোলার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন বড় পরীক্ষা হবে আলোচনার অগ্রগতিকে বাস্তব চুক্তিতে রূপ দেওয়া, ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা এবং সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী করা।

সম্মেলন শেষ হলেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে:

ব্যাংককের সম্মেলন শেষ হলেও ঋণনির্ভর উন্নয়ন, বৈষম্য ও পরিবেশগত ক্ষতি নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি। সম্মেলন চলাকালে নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর ধারাবাহিক প্রতিবাদ আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতির সামাজিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন সামনে এনেছে। অন্যদিকে, ২০২৭ ও ২০২৮ সালের সম্মেলন ওয়াশিংটনে এবং ২০২৯ সালের সম্মেলন আবুধাবিতে আয়োজনের সূচি নির্ধারিত রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এখন মূল প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তব অর্থায়নে রূপ নেয় এবং সেই অর্থ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে।

রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪