স্টাফ রিপোর্টার: দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, মামলা-হামলা ও দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার অভিজ্ঞতা পেরিয়ে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলীয় সাংগঠনিক কাঠামো সচল রাখা, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠন, তৃণমূলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামাল দেওয়া-সব মিলিয়ে একসঙ্গে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে দলটিকে।
বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের প্রতিযোগিতা, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রশ্নে বিএনপির সামনে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ।
সরকার পরিচালনার ব্যস্ততার মধ্যেও সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি আনা এবং কেন্দ্রের সঙ্গে তৃণমূলের দূরত্ব কমিয়ে আনার ওপরই এখন নির্ভর করছে দলটির সাংগঠনিক স্থিতিশীলতা।
গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসজুড়ে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে সাংগঠনিক রদবদল, কমিটি বিলুপ্তি এবং বহিষ্কারাদেশের মতো ঘটনাগুলো রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্তি এবং সহযোগী সংগঠনগুলোতে শুদ্ধি অভিযান দলটির সাংগঠনিক পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
একটি রাজনৈতিক দলের প্রাণশক্তি হলো তার তৃণমূল-ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের কমিটি। এই সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর ভর করেই দল জনসম্পৃক্ততা তৈরি করে এবং নতুন নেতৃত্বের জন্ম দেয়।
কিন্তু বিএনপির ক্ষেত্রে এই জায়গাটিতে বড় ধরনের স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বিএনপি দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দলটির ৮২টি জেলা ও মহানগর কমিটির মধ্যে ৭২টিরই মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। জাতীয় কাউন্সিল না হওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে কমিটি পুনর্গঠন না করায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গুটিকয়েক নেতার একচ্ছত্র প্রভাব তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন ও তরুণ নেতৃত্বের সামনে উঠে আসার পথ অনেকটাই রুদ্ধ হয়ে আছে।
মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। অনেক জেলাতেই পুরোনো কমিটিগুলো নিষ্ক্রিয়, অথচ নতুন কমিটি গঠনের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। আবার কোথাও কোথাও পুরোনো নেতারাই নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে নতুন কমিটিতেও পদ আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করছেন। ফলে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে একধরনের চাপা ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
বিএনপির সাংগঠনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় চমকটি আসে গত ৩০ সেপ্টেম্বর। ওই দিন কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না করেই ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে যুবদল ও ছাত্রদলের সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কমিটিও ভেঙে দেওয়া হয়।
গত দেড় দশকে বিএনপির যেসব নেতা-কর্মী রাজপথে রক্ত দিয়েছেন, অসংখ্য মামলার মুখোমুখি হয়েছেন এবং সর্বস্বান্ত হয়েছেন, বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। তাদের দাবি, নতুন কমিটি গঠন এবং আসন্ন নির্বাচনগুলোতে তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হিসাব-নিকাশ কিছুটা ভিন্ন। রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকায় এখন শুধু রাজপথের আন্দোলনকারী নয়, বরং সংগঠন পরিচালনায় দক্ষ, বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমন্বয় করতে সক্ষম এবং সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব খুঁজছে কেন্দ্র।
যশোরের এক তৃণমূল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যখন বিরোধী দলে ছিলাম, তখন আমরা পুলিশের লাঠিপেটা খেয়েছি । আর এখন যখন দল ক্ষমতায়, তখন দেখছি যারা এত দিন নিষ্ক্রিয় ছিল বা বিদেশে আরাম-আয়েশে ছিল, তারা এসে পদে বসার জন্য কেন্দ্রে দৌড়ঝাঁপ করছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঐক্যের সংকট
বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্বের তীব্র প্রতিযোগিতা এবং নির্বাচনী মনোনয়ন নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহকে দলের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। দলটি এখন ক্ষমতায় থাকায় আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে-সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে-বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া মানেই বিজয়ের অর্ধেক পথ পাড়ি দেওয়া, এমন একটি অলিখিত ধারণা তৃণমূলে তৈরি হয়েছে।
ফলে একই এলাকায় একাধিক প্রভাবশালী নেতা প্রার্থী হতে চাইছেন। এই প্রতিযোগিতা অনেক স্থানেই ব্যক্তিগত বিরোধ, কুৎসা রটনা এবং পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার রূপ নিচ্ছে। কেন্দ্র থেকে সমন্বয়ের চেষ্টা করা হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা কাজে আসছে না। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ কোনো লিখিত মানদণ্ড না থাকায় লবিং-বাণিজ্যের অভিযোগও উঠছে। অভ্যন্তরীণ এই কোন্দল শক্ত হাতে দমন করা না গেলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
রাজনৈতিক দলে শৃঙ্খলা বজায় রাখা অপরিহার্য। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ালে তার দায়ভার পুরো দলের ওপর পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বহিষ্কারের সংখ্যা বাড়িয়ে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রমাণ দেওয়া যায় না। গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হচ্ছে কি না এবং একই অপরাধে প্রভাবশালীদের ছাড় দিয়ে কেবল অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি।
প্রমাণিত অপরাধ এবং নিছক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বা দলীয় গ্রুপিংয়ের শিকার হওয়ার মধ্যে পার্থক্য করতে না পারলে দলের অভ্যন্তরীণ ন্যায়বিচারব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধের প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সবার জন্য একই নিয়ম কার্যকর করা জরুরি।
দল ও সরকার পরিচালনার দ্বৈত সংকট
বিএনপির বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় জায়গাটি হলো দল ও সরকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা। দলের শীর্ষ ও প্রভাবশালী নেতারা বর্তমানে মন্ত্রিসভা, সংসদ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত। ফলে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমে তারা পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না।
কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারা যখন সরকারি দপ্তরে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়ে ব্যস্ত, তখন নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় কিংবা জেলা পর্যায়ের দলীয় কার্যালয়গুলোতে একধরনের নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা চাইলেই আগের মতো কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে পৌঁছাতে পারছেন না। এই দূরত্ব তৃণমূলের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ ও অসন্তোষের জন্ম দিচ্ছে। সরকার ও দলের মধ্যে দ্রুত কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা না গেলে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, বিএনপির সামনে এখন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোর দ্রুত পুনর্গঠন, স্থানীয় নির্বাচনে মনোনয়ন নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধ এড়ানো এবং সরকারের পাশাপাশি দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখা-এই কাজগুলো একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রের নির্দেশনা ও মাঠের বাস্তবতার মধ্যকার এই যোজন যোজন দূরত্ব ঘোচানোই এখন বিএনপির প্রধান কাজ। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তৃণমূলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতা আনা এবং সাধারণ মানুষের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত হতে পারে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলানিউজকে বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা ও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় বিএনপি কঠোর অবস্থান নিয়েছে, যার প্রমাণ ইতোমধ্যে দেশবাসী দেখেছে। যত বড় নেতাই হোন না কেন, অনিয়মের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বদ্ধপরিকর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, দল ক্ষমতায় থাকলে নানা ধরনের বিভ্রান্তি ও গুজব ছড়িয়ে দলটিকে ঘায়েল করার চেষ্টা করা হয়। আশা করি, বিএনপি সময়ের ব্যবধানে এসব সমস্যার সমাধান করতে পারবে।
রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ