| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

মোদী-শাহের নির্দেশে 'ভোট চুরি'! নির্বাচন কমিশনারকে হটানোর দাবিতে 'জন ইমপিচমেন্ট' ইন্ডিয়া জোটের

reporter
  • আপডেট টাইম: অক্টোবর ৩১, ২০২৬ ইং | ১৯:৫২:৫৭:অপরাহ্ন  |  ৮১০ বার পঠিত
মোদী-শাহের নির্দেশে 'ভোট চুরি'! নির্বাচন কমিশনারকে হটানোর দাবিতে 'জন ইমপিচমেন্ট' ইন্ডিয়া জোটের

আশিস গুপ্ত, নয়াদিল্লী : ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্রমবর্ধমান বিতর্কের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন রাজনৈতিক প্রতিবাদে নামল বিরোধী ইন্ডিয়া জোট। শনিবার নয়াদিল্লির রাজাজি মার্গে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের সরকারি বাসভবনে আয়োজন করা হয় প্রতীকী ‘জন অভিশংসন’ বা ‘পাবলিক ইমপিচমেন্ট’ কর্মসূচি। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব, ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়া এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে শাসকদলের স্বার্থে প্রভাবিত করার অভিযোগ তুলে এই কর্মসূচির আয়োজন করে বিরোধী জোট। 

পুরনো সংসদ ভবনের কেন্দ্রীয় কক্ষের আদলে তৈরি মঞ্চে কার্যত একটি প্রতীকী সংসদীয় অধিবেশনের আয়োজন করা হয়। লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার মীরা কুমার অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে অভিযোগসংবলিত প্রস্তাব উত্থাপন করেন। অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব, ইন্ডিয়া জোটের বিভিন্ন শরিক দলের নেতা, সাংসদ, কয়েকটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। শুধু রাজনৈতিক নেতারাই নন, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যাঁদের নাম বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ, সেই সাধারণ নাগরিকদেরও বক্তব্য শোনার ব্যবস্থা করা হয়। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগকে একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রশ্ন হিসেবে সামনে নিয়ে আসা।

বিরোধীদের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশন কেবল একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়, দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক রক্ষাকবচ। সেই প্রতিষ্ঠান যদি শাসকদলের প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সাংবিধানিক নিশ্চয়তাই বিপন্ন হয়ে পড়ে। অধিবেশনে খাড়গে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে মোট ছয়টি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার পরিকল্পিত চক্রান্তের অংশ হিসেবে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩.২ কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। সংসদের অনুমোদন ছাড়াই ভোটার নিবন্ধনের ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন আনা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। 

তাঁর বক্তব্য, নতুন ইসিআইনেট ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোটার তালিকার ওপর অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। পাশাপাশি, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারকে কার্যত উপেক্ষা করা হচ্ছে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করছেন বলে অভিযোগ তোলেন খাড়গে। বিরোধীদের মতে, এই সমস্ত পদক্ষেপ সম্মিলিতভাবে নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। খাড়গে তাঁর বক্তব্যে সংবিধানের ৩২৬ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করেন। এই অনুচ্ছেদেই প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ভোটাধিকারের সাংবিধানিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। 

স্বাধীন ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অর্জন হিসেবে সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ভোটাধিকার কেবল একটি রাজনৈতিক অধিকার নয়, বরং নাগরিকের সমান মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মৌলিক ভিত্তি। ধর্ম, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা কিংবা আর্থিক অবস্থানের পার্থক্য নির্বিশেষে প্রত্যেক যোগ্য নাগরিকের ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার প্রয়োগের সুযোগ যদি ভোটার তালিকা থেকেই কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। খাড়গের অভিযোগ, ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিকে দুর্বল করার জন্য একাধিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। 

বিরোধী দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দলবদলে উৎসাহিত করা, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) ও সিবিআইয়ের অপব্যবহার এবং নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে কর্পোরেট অর্থের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের পাশাপাশি এবার সরাসরি ভোটার তালিকা ও নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে বলে তিনি দাবি করেন। 

তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শাসকদলের সাফল্য নিশ্চিত করার জন্য যদি ভোটার তালিকার চরিত্রই বদলে দেওয়া হয়, তাহলে গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষভাবে সমালোচনা করেন ২০২৩ সালের ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, চাকরির শর্তাবলি ও কার্যকালের মেয়াদ) আইন’-এর। এই আইনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ। 

খাড়গের বক্তব্য, আইনটি পাস করার সময় বিরোধী সাংসদদের একটি বড় অংশকে সংসদ থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, এই আইনের মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এমন আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, যা কার্যত তাঁকে জবাবদিহির বাইরে রাখার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তাঁর মতে, একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের একতরফা প্রভাব থাকা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে বিপজ্জনক। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়া। 

নির্বাচন কমিশনের যুক্তি, ভোটার তালিকাকে নির্ভুল রাখা, মৃত ও স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং ভুয়ো বা একাধিক জায়গায় থাকা নাম শনাক্ত করাই এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য। কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ, বাস্তবে এই সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ পড়ছে। বিশেষ করে দরিদ্র, প্রান্তিক, পরিযায়ী শ্রমিক, সংখ্যালঘু এবং সমাজের দুর্বল অংশের মানুষ এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাঁদের আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করতে না পারা কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বহু যোগ্য নাগরিক ভোটাধিকার হারাতে পারেন। 

বিরোধীদের উত্থাপিত প্রায় ১৩.২ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়ার অভিযোগটি এই বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাদের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে এত বিপুল সংখ্যক নাম বাদ যাওয়ার ঘটনা নিছক প্রশাসনিক সংশোধন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কেন এত মানুষের নাম বাদ গেল, কতজনের নাম মৃত বা স্থানান্তরিত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, কতজনের ক্ষেত্রে নথিপত্রের অভাবকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং কতজনের নাম ভুলবশত বাদ পড়েছে—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন। 

শুধু মোট সংখ্যা জানানো যথেষ্ট নয়; বাদ পড়া প্রত্যেক ভোটারের জন্য আপত্তি জানানোর কার্যকর সুযোগ এবং নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার সহজ ব্যবস্থা থাকা জরুরি। এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকলে ভোটার তালিকা সংশোধনই নাগরিকের ভোটাধিকার সংকুচিত করার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে বলে বিরোধীরা মনে করছে।ইসিআইনেট ব্যবস্থাকে নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন খাড়গে। নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন ডিজিটাল পরিষেবাকে একটি অভিন্ন ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে এই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। 

কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে ভোটার তালিকার তথ্য ও সংশোধন প্রক্রিয়ার ওপর অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, প্রযুক্তির ব্যবহার যদি যথাযথ নজরদারি, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং স্বাধীন যাচাইয়ের ব্যবস্থা ছাড়া করা হয়, তাহলে ভোটার তালিকায় ভুল সংশোধন কিংবা নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিকের পক্ষে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়া কঠিন হয়ে উঠবে। বিশেষ করে ডিজিটাল পরিষেবা ব্যবহারে অক্ষম গ্রামীণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষের সমস্যা আরও বাড়তে পারে। 

খাড়গে আরও অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী তিন সদস্যের কমিশনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পাশাপাশি অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁদের কার্যত উপেক্ষা করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত কোনও একজন ব্যক্তির ইচ্ছা বা নির্দেশে পরিচালিত হতে পারে না। কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ এবং সেখানে তিন সদস্যের মতামত কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, সেই প্রশ্নেরও জবাব প্রয়োজন। 

প্রতীকী অধিবেশনের সূচনা করে মীরা কুমার বলেন, ভোটাধিকার রক্ষা করা গণতন্ত্রের অস্তিত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাঁর অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষ জানতে পারছেন যে তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, অথচ কেন তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে যথাযথ ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে শুধু রাজনৈতিক দল নয়, সাধারণ নাগরিকদেরও নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তিনি মনে করিয়ে দেন, ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র। 

এশিয়া, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার বহু দেশ ভারতের গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতাকে অনুসরণ করে। ফলে ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পর্কে মানুষের আস্থা নষ্ট হলে তার প্রভাব দেশের সীমানার বাইরেও পড়বে। এই প্রতীকী অধিবেশনে যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ, তাঁদের বক্তব্য শোনার ব্যবস্থা ছিল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিরোধীদের উদ্দেশ্য ছিল, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগের পাশাপাশি সমস্যাটিকে সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরা। কারণ ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে একজন যোগ্য নাগরিক নির্বাচনে প্রার্থীকে পছন্দ করার কিংবা সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হারান। সেই অর্থে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া শুধু একটি প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, নাগরিকের রাজনৈতিক অস্তিত্বকেই প্রভাবিত করতে পারে। খাড়গে এই অধিবেশন থেকে তিনটি প্রধান দাবি সামনে আনেন। 

প্রথমত, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরাতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগসংক্রান্ত আইন পরিবর্তন করে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অধিকতর নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বিরোধীদের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু ব্যক্তিবিশেষের পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, কমিশনের নিয়োগ, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং জবাবদিহির কাঠামোতেও সংস্কার প্রয়োজন। তবে এই ‘জন অভিশংসন’-এর সাংবিধানিক বা আইনি ক্ষমতা নেই। এটি সংসদে অনুষ্ঠিত প্রকৃত অভিশংসন প্রক্রিয়া নয়, বরং একটি প্রতীকী রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ। সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ও ক্ষমতা নির্ধারিত হয়েছে। 

অন্যদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে পদ থেকে অপসারণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে অপসারণের মতোই কঠোর সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সংসদের উভয় কক্ষে নির্দিষ্ট সাংবিধানিক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রস্তাব অনুমোদিত হওয়ার প্রয়োজন। ফলে বিরোধী জোটের এই প্রতীকী অধিবেশনের মাধ্যমে জ্ঞানেশ কুমারের পদ সরাসরি বিপন্ন হবে না। এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অন্য জায়গায়—নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগকে সংসদের বাইরে একটি বৃহত্তর জনপরিসরে নিয়ে যাওয়া এবং নাগরিকদের সামনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করা। প্রকৃত অপসারণের জন্য বিরোধীদের সংসদীয় প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাও অর্জন করতে হবে। এই কর্মসূচিকে ঘিরে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাতও তীব্র হয়েছে। 

বিরোধীদের অভিযোগ, প্রথমে অশোকা হোটেল এবং পরে রামলীলা ময়দানে এই কর্মসূচি আয়োজনের অনুমতি পাওয়া যায়নি। কংগ্রেস নেতা কে সি বেণুগোপাল অভিযোগ করেছিলেন, দিল্লি পুলিশের বাধার পিছনে কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত রয়েছে। শেষ পর্যন্ত খাড়গের বাসভবনেই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। 

প্রথমে ৩০ অক্টোবর এই অধিবেশন হওয়ার কথা থাকলেও দিল্লিতে বৃষ্টির কারণে তা একদিন পিছিয়ে ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়। প্রতীকী ‘জন অভিশংসন’-এর পরদিন, অর্থাৎ ১ নভেম্বর দিল্লির রামলীলা ময়দানে বৃহত্তর সমাবেশের ডাক দিয়েছে ইন্ডিয়া জোট। ‘ভোট চোরি’র অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার প্রতিবাদে এই সমাবেশে বিভিন্ন বিরোধী দলের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, ছাত্র, যুব, শ্রমিক, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষকে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। 

রামলীলা ময়দানের সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের লক্ষ্য শুধু প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণের দাবি তোলা নয়, বরং নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে দেশজুড়ে জনমত গড়ে তোলা। সব মিলিয়ে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে এই প্রতীকী অভিশংসন কর্মসূচি ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এর মাধ্যমে বিরোধীরা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—নির্বাচন কমিশন যদি নাগরিকদের ভোটাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে যথেষ্ট স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে না পারে, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তি কতটা নিরাপদ থাকবে? নির্বাচনে কে জিতল বা কে হারল, তার বাইরেও এই প্রশ্নের গুরুত্ব রয়েছে। 

কারণ গণতন্ত্রের বৈধতা শুধু নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে প্রত্যেক যোগ্য নাগরিক ভোট দেওয়ার সমান সুযোগ পাচ্ছেন কি না, ভোটার তালিকা নির্ভুল থাকছে কি না এবং নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করছে কি না, তার ওপর। বিরোধীদের অভিযোগগুলির সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব অবশ্যই প্রমাণ, নথি ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এই প্রশ্নগুলির স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য জবাব না পাওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনআস্থা নিয়ে বিতর্ক যে আরও গভীর হবে, তা বলাই যায়।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪