| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

পাকিস্তানের ক্ষুধা সংকট: খাদ্য বরাদ্দের চেয়ে প্রতিরক্ষা খাতে বাজেটকে অগ্রাধিকার

reporter
  • আপডেট টাইম: নভেম্বর ০৪, ২০২৬ ইং | ১৯:৫৩:১০:অপরাহ্ন  |  ১৮৯৪ বার পঠিত
পাকিস্তানের ক্ষুধা সংকট: খাদ্য বরাদ্দের চেয়ে প্রতিরক্ষা খাতে বাজেটকে অগ্রাধিকার

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: ২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে (গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স) পাকিস্তানের স্কোর ২৫.৫। ১২২টি দেশের মধ্যে দেশটির অবস্থান ১০৬তম, যা দক্ষিণ এশিয়ার কার্যকর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। ২০২২ সালে সার্বভৌম ঋণখেলাপি হওয়া এবং পরবর্তী বছরগুলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর্মসূচির অধীনে কাটানো শ্রীলঙ্কার স্কোর ১০.২, যা দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষুধার সর্বনিম্ন মাত্রা নির্দেশ করে। বাংলাদেশের স্কোর ১৯.২ এবং নেপালের ১৪.৫—উভয়ই মাঝারি পর্যায়ে। ভারতের স্কোর ২৪.১। পাকিস্তানের স্কোর আঞ্চলিক গড় ২৩.৫-এর চেয়ে খারাপ এবং বৈশ্বিক গড় ১৮.১-এর তুলনায় অনেক বেশি উদ্বেগজনক। জলবায়ু ও পণ্যমূল্যের একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও প্রতিবেশী দেশগুলো ক্ষুধার এমন অবনতি এড়াতে পেরেছে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এই অবনতির পেছনে কোনো বাহ্যিক অভিঘাতের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।

সূচকে অবস্থানের চেয়েও উদ্বেগজনক হলো এর দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা। ২০০০ সালে পাকিস্তানের স্কোর ছিল ৩৬.২, যা বর্তমানে কমে ২৫.৫-এ দাঁড়িয়েছে। তবে সূচকটি স্পষ্ট করে যে, এই উন্নতির অধিকাংশই ২০১৮ সালের আগে অর্জিত হয়েছিল। এরপর থেকে অপুষ্টির হার নিম্ন পর্যায় থেকে মাঝারি পর্যায়ে উঠেছে এবং শিশুদের শারীরিক ক্ষয়ের (ওয়েস্টিং) হার উচ্চসীমার দিকে এগিয়েছে। পাকিস্তান আগের সরকারগুলোর অর্জিত সাফল্যগুলোকে উল্টে দিচ্ছে। একই সময়ে সামরিক নির্দেশনায় পরিচালিত একটি বেসামরিক প্রশাসন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করেছে।

সূচকের অন্তর্নিহিত পরিসংখ্যান এমন এক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থার চিত্র তুলে ধরে, যাকে ইসলামাবাদ জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করতে চাইছে না। দেশটির ১৬.১ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৩৩.৬ শতাংশের উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম (স্টান্টিং), ৯.৮ শতাংশ শিশু শারীরিক ক্ষয়ের (ওয়েস্টিং) শিকার এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার ৫.৬ শতাংশ।

প্রতি তিন শিশুর একজনের উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম—এমন পরিসংখ্যান নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য যথেষ্ট। জীবনের প্রথম এক হাজার দিনের পর এই ক্ষতি অনেকাংশে অপূরণীয় হয়ে ওঠে। এর ফলে শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কমে যায়, সারা জীবনের আয় অর্জনের ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং উৎপাদনশীলতা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাকিস্তান কার্যত সেই প্রজন্মের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে ধ্বংস করছে, যাদের সুরক্ষা দেওয়ার দাবি দেশটির সরকার করে থাকে।

তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার তথ্য নিশ্চিত করে যে, এটি কেবল দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যা নয়; বরং তাৎক্ষণিক সংকটও। ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৭৫ লাখ মানুষ—বিশ্লেষিত জনগোষ্ঠীর ২১ শতাংশ—‘সংকট’ (ক্রাইসিস) বা তার চেয়েও খারাপ পরিস্থিতিতে ছিল। এর মধ্যে ১২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ ‘জরুরি’ (ইমার্জেন্সি) অবস্থায় রয়েছে, যাদের জীবন রক্ষায় অবিলম্বে সহায়তা প্রয়োজন।

২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের প্রাক্কলনে ৬৭ লাখ মানুষকে সংকট বা তার চেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকার কথা বলা হয়েছে। এই আপাত হ্রাসের প্রধান কারণ প্রকৃত পরিস্থিতির উন্নতি নয়, বরং বিশ্লেষণের ভৌগোলিক পরিধি কমে যাওয়া। বিশ্লেষণে মাত্র ৪৫টি গ্রামীণ জেলা অন্তর্ভুক্ত ছিল—বেলুচিস্তানের ১৯টি, সিন্ধুর ১২টি এবং খাইবার পাখতুনখোয়ার ১৪টি জেলা। এসব জেলায় মোট ৩ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ বাস করে, যা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশগুলোর মধ্যে রয়েছে দুটি বিদ্রোহকবলিত প্রদেশ এবং তৃতীয় একটি প্রদেশ, যার নির্বাচিত সরকারকে চলতি মাসেই ইসলামাবাদের সামরিক-সমর্থিত সরকার স্থগিত করেছে।

পাকিস্তানের ভয়াবহ ক্ষুধা পরিস্থিতির ব্যাখ্যা জলবায়ু বা পণ্যমূল্যের চেয়ে দেশটির বাজেটের অগ্রাধিকারে বেশি স্পষ্ট। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কেন্দ্রীয় বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে ৩ ট্রিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭.৬ শতাংশ বেশি। অস্ত্র সংগ্রহের জন্য বরাদ্দ বেড়েছে ৩৯.৬ শতাংশ, যা দাঁড়িয়েছে ৯২৫.৮ বিলিয়ন রুপিতে।

অন্যদিকে, স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দ মাত্র ৫৩.৩ বিলিয়ন রুপি। এর মধ্যে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের পুরো পোর্টফোলিওর জন্য বরাদ্দ মাত্র ২৪.৩ বিলিয়ন রুপি। সামরিক পেনশনের জন্য আলাদাভাবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮২২ বিলিয়ন রুপি, যা স্বাস্থ্য খাতের মোট বরাদ্দের ১৫ গুণেরও বেশি।

সরকারের নিজস্ব অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, জনস্বাস্থ্যে ব্যয় করা অর্থের পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ০.৮ শতাংশ। যে দেশ নাগরিকদের স্বাস্থ্যের পেছনে ব্যয় করা প্রতি এক রুপির বিপরীতে সেনাবাহিনীর জন্য প্রায় ৫৬ রুপি ব্যয় করে, তারা কোন বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়, তা স্পষ্ট।

পাকিস্তানের গম নীতিও দেখায় যে, এই ব্যর্থতা কেবল বাজেটের নয়, প্রশাসনিকও। আইএমএফের বেলআউট কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত সংস্কারের অংশ হিসেবে ইসলামাবাদ গমের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (সাপোর্ট প্রাইস) ব্যবস্থা বাতিল করে। এরপর গম সংগ্রহের প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে।

পাঞ্জাবে ৩০ লাখ টন গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সংগ্রহ করা সম্ভব হয় মাত্র ৪ লাখ ৮০ হাজার টন। সিন্ধুতে সংগ্রহের পরিমাণ ছিল ২ লাখ টনেরও কম। এর ফলে জাতীয় গমের মজুত কমে যায়। পরে পাকিস্তান ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয়ে প্রায় ৩৫ লাখ টন গম আমদানি করে। তা সত্ত্বেও দেশটিতে ঘাটতি রয়ে গেছে। কৃষক প্রতিনিধিরা সতর্ক করেছেন, গমের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে, যা সাধারণ পাকিস্তানিদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে আটা-ময়দাকে ঠেলে দিতে পারে।

জনসংখ্যার হিসাব অনুযায়ী, পাকিস্তানের ক্ষুধা সংকট প্রতি বছর আরও জটিল হয়ে উঠছে। ২০২৩ সালের আদমশুমারিতে দেশটির জনসংখ্যা ছিল ২৪ কোটি ১৫ লাখ। ছয় বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে ৩ কোটি ৩৮ লাখ, বার্ষিক বৃদ্ধির হার ২.৫৫ শতাংশ। প্রতি বছর নতুন করে যুক্ত হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষ। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ জনসংখ্যা ৪০ কোটির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।

পাকিস্তানে একজন নারীর সন্তান জন্মদানের হার এখনো প্রায় ৩.৬। তুলনায় ভারতে এই হার প্রায় ২.০, বাংলাদেশে ২.১ এবং ইরানে ১.৭। ২০১৮ সালে কাউন্সিল অব কমন ইন্টারেস্টস (সিসিআই) ২০২৫ সালের মধ্যে জন্মহার ২.৮-এ নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।

এ ছাড়া পাকিস্তানে মাথাপিছু পানির প্রাপ্যতা এক হাজার ঘনমিটারের সংকটসীমার নিচে নেমে গেছে। পাঁচ থেকে ১৬ বছর বয়সী প্রায় ২ কোটি শিশু এখনো স্কুলের বাইরে। অথচ শিক্ষা দীর্ঘমেয়াদে জন্মহার কমানো এবং শিশুদের পুষ্টির মান উন্নয়নের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়গুলোর একটি।

পাকিস্তানের ক্ষুধা সংকট তাই কেবল খাদ্যের অভাবের প্রশ্ন নয়। এটি বাজেটের অগ্রাধিকার, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি, পানির সংকট এবং শিশুদের শিক্ষা ও পুষ্টিতে দীর্ঘদিনের অবহেলার সম্মিলিত ফল।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪