আশিস গুপ্ত, নয়াদিল্লি: ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে ভারতে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশে ৩,২২০ জনের মৃত্যু হয়েছে, মারা গেছে প্রায় ৪৭,২৪৪টি গবাদি পশু এবং ৪.২৫ মিলিয়ন হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এতে গৃহহীন হয়েছেন অন্তত ১,২৮,৩৩৪টি পরিবার, যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ঋণের জালে এবং চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিজ্ঞান ও পরিবেশ কেন্দ্র এবং 'ডাউন টু আর্থ' প্রকাশিত ‘ক্লাইমেট ইন্ডিয়া ২০২৬’শীর্ষক রিপোর্টে জলবায়ু পরিবর্তনের এই ভয়াবহ রূপ প্রকাশ করা হয়েছে।
সম্প্রতি আয়োজিত এক ওয়েবিনার অনুষ্ঠানে বার্ষিক এই রিপোর্টটি উন্মোচন করে সিএসই-র নির্দেশক সুনীতা নারায়ণ এই উদ্বেগজনক তথ্যগুলো তুলে ধরেন। ‘ক্লাইমেট ইন্ডিয়া ২০২৬’ হলো সিএসই এবং ডাউন টু আর্থ কর্তৃক প্রকাশিত ভারতের চরম আবহাওয়া সংক্রান্ত একটি বিশেষ বার্ষিক ই-অ্যাটলাস ও মূল্যায়ন প্রতিবেদন।
এ বছরের সংস্করণে ২০২২ থেকে ২০২৬—এই শেষ পাঁচ বছরের প্রবণতার একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনের মূল তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম নয় মাসের ২৭৩ দিনের মধ্যে ৯২ শতাংশ দিনেই ভারতজুড়ে শৈত্যপ্রবাহ, দাবদাহ, বজ্রপাত, ঝড়, অতিবৃষ্টি, বন্যা ও ধসের মতো ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। রাজ্যগুলোর মধ্যে উত্তর প্রদেশ এবং হিমাচল প্রদেশ এই ২৭৩ দিনের প্রায় ৬৪ শতাংশ দিনেই চরম আবহাওয়া প্রত্যক্ষ করেছে।
রাজ্যভিত্তিক মৃতের তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে উত্তর প্রদেশ (৮১১ জন), এরপরেই রয়েছে মহারাষ্ট্র (২৮৬ জন) ও বিহার (২৪৫ জন)। অন্যদিকে, ফসলের ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মহারাষ্ট্র (২.৮৩ মিলিয়ন হেক্টর), উত্তর প্রদেশ (০.৬৯ মিলিয়ন হেক্টর) এবং বিহার (০.২৩ মিলিয়ন হেক্টর)।
ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবে উত্তর-পশ্চিম ভারতে সবচেয়ে বেশি ২৩৫ দিন চরম আবহাওয়ার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৬ সাল আবহাওয়ার একাধিক রেকর্ড ভেঙেছে। ১৯০১ সালের পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস ছিল সবচেয়ে শুষ্ক এবং ১২৫ বছরের ইতিহাসে চতুর্থ উষ্ণতম। জুলাই মাসে ভারতের গড় তাপমাত্রা ছিল ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ। উত্তর-পশ্চিম ভারতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে রাতের গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল, যা এই অঞ্চলে উষ্ণতার একটি বড় রেকর্ড।
রিপোর্টটি তৈরির নেপথ্যে থাকা ডাউন টু আর্থ-এর ম্যানেজিং এডিটর রিচার্ড মহাপাত্র বলেন, দেশে যা ঘটছে তা বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে তৈরি হওয়া এক নতুন ‘স্বাভাবিক পরিস্থিতি’। ভারতে চরম আবহাওয়ার ঘটনার ঘনঘটা এবং এর ভৌগোলিক বিস্তারের সঠিক তথ্য প্রকাশ্যে আনতেই এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, দুর্যোগের পর ত্রাণের চেয়ে ঝুঁকি কমানো এবং সহনশীল পরিকাঠামো গড়ে তোলার দিকে সরকারের মনোযোগ দেওয়া উচিত।
শেষ পাঁচ বছরের (২০২২২-২০২৬) আবহাওয়া প্রবণতা বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই সময়ে চরম আবহাওয়া ভারতে ১৬,৩০৩ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, যার প্রায় ৬৫ শতাংশ মৃত্যু ঘটেছে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে। পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রে গত পাঁচ বছরে মোট ২০.৬ মিলিয়ন হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ৮২ শতাংশই নষ্ট হয়েছে শেষ তিন বছরে। সিএসই-র পরিবেশ সম্পদ কর্মসূচির নির্দেশক কিরণ পান্ডে জানান, প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো শক্তিশালী হওয়া এবং দেশের অর্ধেকেরও বেশি অংশে খরা পরিস্থিতির কারণে কৃষকদের সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
জলবায়ুর এই পরিবর্তন সার্বিক রূপ নিয়েছে। দেশের মধ্য অঞ্চলে দুর্যোগপূর্ণ দিনের হার ২০২২ সালের ৭৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে; পূর্ব ও উত্তর-পূর্বে তা ৬৩ থেকে বেড়ে ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। শীতকালের স্থায়িত্ব ও তীব্রতা কমেছে, পক্ষান্তরে বর্ষার আগেই অর্থাৎ মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে অন্তত ০.৭৩ মিলিয়ন হেক্টর কৃষি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু স্বাভাবিকের চেয়ে ১৩ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত আনলেও বর্ষার ১২২টি দিনেই দেশের কোথাও না কোথাও অতিবৃষ্টি, বন্যা বা ধসের ঘটনা ঘটেছে। সুনীতা নারায়ণ জোর দিয়ে বলেন যে, দেশবাসী আজ একটি দুর্যোগ সামলে ওঠার আগেই পরবর্তী দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। এখন আর এটি কেবল নির্দিষ্ট কোনো একটি রাজ্য বা অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং একটি সর্বভারতীয় সংকট। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে সরকারের এখনই বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব