শুভ্র মজুমদার, কালিহাতী: সময় নামক নির্দয় স্রোত আজ গ্রাস করতে বসেছে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার শতবর্ষী ঐতিহ্য পাটি শিল্পকে। একসময় এ শিল্পের চাকচিক্যে মুখর ছিল গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরবাড়ি। পাটির শীতলতা ছিল বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ—বিয়ে-শাদি, ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা গরম দুপুরের বিশ্রামে পাটি ছাড়া চলতই না। অথচ আজ প্লাস্টিকের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে সেই অতীত গৌরব।
কালিহাতীর বাংড়া, সিলিমপুর, খিলদা, ধুনাইল, এলেঙ্গা, লাঙ্গলজোড়া, ঘূনি, সালেংকা, পাটিতাপাড়া, পিচুটিয়া, আউলটিয়া, মহিষজোড়াসহ বহু হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামেই একসময় ছিল বেতের ক্ষেত। মাঠে মাঠে বাতাসে দুলত বেতগাছ। সেই বেত দিয়েই তৈরি হতো শীতল পাটি, বুকা পাটি, ছাইলা ও আতি যা শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, পৌঁছে যেত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
কিন্তু আজ আর সেসব ক্ষেতের দেখা মেলে না। বেতের জায়গা দখল করেছে অন্য ফসল। শিল্পীরাও কেউ পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে, কেউবা বেছে নিয়েছেন অন্য পেশা। কালিহাতীতে একসময় এই শিল্পে কর্মরত ছিল প্রায় দুই লক্ষ শ্রমিক। এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে হাতে গোনা কিছু পরিবারে।
উপজেলা পাটি শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক হরে কৃষ্ণ পাল বলেন, প্লাস্টিকের পাটির দাপটে বেতের পাটির বাজার প্রায় শেষ। অথচ একসময় দুই লক্ষাধিক মানুষ এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিল। সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ আর সরকারি সহায়তা পেলে আমরা আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারতাম।
সিলিমপুর গ্রামের কারিগর কালাচাঁদ বাবু জানালেন, সরকার যদি পাশে দাঁড়ায় তবে আমরা টিকে থাকতে পারবো। এখন অতি কষ্টে দিন পার করছি।
পিচুটিয়ার আরেক কারিগর সুশান্ত চন্দ্র ধর আবেগভরে বললেন, এই পাটির কাজ ছাড়া আর কিছুই শিখিনি। এটাই আমাদের জীবন, সংসার, বেঁচে থাকার ভরসা। সরকার সাহায্যের হাত না বাড়ালে এ শিল্প একদিন সত্যিই হারিয়ে যাবে।
একসময়কার গর্বের এই শিল্প এখন বিলীন হওয়ার পথে। অথচ চাইলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে আবারও জাগিয়ে তোলা সম্ভব।
না হলে অচিরেই ইতিহাসের পাতায় স্মৃতিচিহ্ন হিসেবেই রয়ে যাবে কালিহাতীর এই ঐতিহ্যবাহী পাটি শিল্প।
রিপোর্টার্স ২৪/ প্রীতিলতা