স্টাফ রিপোর্টার: আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীর কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাটের ইজারা নিয়ে এবার ক্ষমতাসীন বিএনপির স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও। এ কারণে হাট ইজারার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো হাট নিয়ে দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনামূলক পরিস্থিতিও বিরাজ করছে। দক্ষিণ নগর ভবনে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার হাটগুলোতে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে জামায়াতের পাশাপাশি এনসিপির নেতাদেরও সক্রিয় দেখা যাচ্ছে। তবে ঢাকা উত্তর সিটিতে (ডিএনসিসি) বিএনপির একচেটিয়া আধিপত্য লক্ষ করা গেছে।
দীর্ঘদিন পর রাজধানীর পশুর হাট নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রতিযোগিতা। বিগত প্রায় দুই দশক কোরবানির পশুর হাটগুলো ইজারার ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের কারণে প্রতিযোগিতা ছাড়া তুলনামূলক কম মূল্যে হাটগুলো ইজারা হতো। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতো দুই সিটি করপোরেশন। আবার সিন্ডিকেটের কারণে অনেক হাটে খাস আদায়ও করা হতো। তবে এবার প্রতিযোগিতার ফলে সিটি করপোরেশন কিছুটা লাভবান হচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যেও অনেকগুলো হাটের নাম পরিবর্তন করে সরকারি মূল্য তুলনামূলক কম ধরা হয়েছে। এটিও একটি সিন্ডিকেট চক্রের মাধ্যমে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হাটগুলোতে তাদের দলীয় নেতাদের একক আধিপত্য ছিল। প্রতিযোগিতা দূরের কথা তখন বিএনপি বা জামায়াতের কোনো নেতা দরপত্র কেনার সাহসও দেখাননি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা হাটের ইজারা নিয়েছেন। তবে সে সময় কিছু কিছু হাটে জামায়াত, এনসিপি ও গণঅধিকার পরিষদের নেতাদেরও অংশ ছিল বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এবার অন্তত দুই ডজন অস্থায়ী হাট বাসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। ঈদের দিনসহ পাঁচ দিন কোরবানির পশু বেচাকেনার জন্য এসব অস্থায়ী হাট বসানো হবে। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ের দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়েছে। বেশিরভাগ হাটে তীব্র প্রতিযোগিতা হলেও ডিএসসিসির ২টি এবং ডিএনসিসির ৪টি হাটে কোনো দরপত্র জমা পড়েনি। ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার কারণে এটা হয়েছে বলে জানা গেছে। সিন্ডিকেট করে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্যে হাটগুলো ইজারা নিয়ে যাওয়া হয়। এতে সিটি করপোরেশনগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গত বৃহস্পতিবার ডিএসসিসির ১২টি অস্থায়ী হাটের দরপত্র বাক্স খোলা হয়। ইজারাদার ও তাদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে দরপত্রগুলো যাচাই-বাছাই করে সর্বোচ্চ দরদাতা নির্ধারণ করা হয়। যেসব হাটে সর্বোচ্চ দরদাতা পাওয়া যায়নি সেগুলো দ্বিতীয় ধাপে টেন্ডারে যাবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তাদের মতে, এ বছর বিএনপি নেতাদের পাশাপাশি জামায়াত নেতারাও হাটের ইজারা পাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামার কারণে ভালো দর পাওয়া গেছে।
ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ‘দনিয়া কলেজের পূর্ব পার্শ্বে ও সনটেক মহিলা মাদ্রাসার পূর্ব-পশ্চিমের খালি জায়গা’ নামের হাটটি স্থানীয় বিএনপির নেতা তারিকুল ইসলাম তারেক ইজারা নেন। তবে পেছনে ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাবেক নেতা নবীউল্লাহ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক কাউন্সিলর জুম্মন। এ বছর তারেক দরপত্রের জন্য ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার পে-অর্ডার জমা দিলেও কোনো দর উল্লেখ করেননি।
এ হাটের জন্য স্থানীয় জামায়াত নেতা শামীম খানের প্রতিষ্ঠান কে বি ট্রেড সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা দর দিয়েছে। করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগ দর উন্মুক্তের সময় এ হাটটি চূড়ান্ত না করে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছে। সর্বোচ্চ পে-অর্ডার দেওয়া প্রতিষ্ঠানটিকে দর জানাতে সিটি করপোরেশন থেকে চিঠি দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের নদীর পাড়ের খালি জায়গা’ পশুর হাটটির এ বছর সরকারি মূল্য ছিল ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। কাজী মাহবুব মওলা হিমেল হাটটি ৪ কোটি ১ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন। স্থানীয় জামায়াত নেতাদের সমর্থনে মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন হাটটিতে ৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা দর দিয়েছিলেন।
‘আমুলিয়া মডেল টাউনের খালি জায়গা’র সরকারি মূল্য ছিল ৫৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬৬৭ টাকা। এ বছর তা কমিয়ে ৫৩ লাখ টাকা করা হয়। গত বছর হাটটি ডেমরা থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদিন রতন ৫৫ লাখ টাকায় নেন। এ বছর হাটটি তিনি ২ কোটি ১৫ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন। এই হাটের দরপত্রেও জামায়াতের নেতারা প্রতিযোগিতা করেছেন।
গোলাপবাগ মাঠসংলগ্ন খালি জায়গা’র সরকারি মূল্য ছিল ৫৩ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। ছয়টি দরপত্রের মধ্যে ২ কোটি ৫ লাখ টাকায় আহসানউল্লাহ নামে স্থানীয় বিএনপি নেতা হাটটির ইজারা নিয়েছেন। এই হাটে জামায়াত ও এনসিপির নেতারা পৃথক ইজারা দর দিয়েছিলেন।
বিভিন্ন হাট ইজারা নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত ২৭ এপ্রিল দুপুর ১টার দিকে ডিএসসিসি নগর ভবনের সম্পত্তি বিভাগে যাত্রাবাড়ীর ‘কাজলা, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট এবং শ্যামপুর কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ড সংলগ্ন খালি জায়াগা’ হাটের দরপত্র সংগ্রহ করতে এলে শ্যামপুর থানা জামায়াতের আমির মোহাম্মদ মহিউদ্দিনসহ জামায়াতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শ্যামপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিমেল, যাত্রাবাড়ী থানা বিএনপি নেতা শ্যামলের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে।
সম্পত্তি বিভাগে অতিরিক্ত পুলিশও মোতায়েন করা হয়। পরবর্তীতে ডিএসসিসির সব আঞ্চলিক কার্যালয় ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে দরপত্র বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। দরপত্র উন্মুক্তের দিন অর্থাৎ গত বৃহস্পতিবারও নগর ভবনে নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা গেছে।
সম্পত্তি বিভাগের এক কর্মকর্তার দাবি করেছেন, দরপত্র বিক্রি ও জমাদানে একাধিক বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে নগর ভবনে বেশ কয়েকদিন উত্তেজনা বিরাজ করতে দেখা যায়। তবে অধিকাংশ হাটে একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেওয়ায় দরপত্রে প্রতিযোগিতা হয়েছে। ডিএসসিসির পশুর হাটে দুই দশক পরে এমন প্রতিযোগিতা দেখা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের এক নেতা জানান, এবার পশুর হাটসহ বিভিন্ন জায়গায় তাদের নেতাকর্মীরা ইজারায় অংশ নেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের সময়ে তারা কোনো ধরনের সরকারি দরপত্রের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেননি। এ বছর ডিএসসিসির অন্তত দুটি হাটে দরপত্র কিনেছেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা। বৈধ যেকোনো ব্যবসার ক্ষেত্রে সংগঠন থেকে কোনো বাধা নেই বলেও জানান এ নেতা।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার ইজারার দর উন্মুক্ত করা ডিএসসিসির হাটের মধ্যে দুটি হাটে সিন্ডিকেটের কারণে কোনো দরই জমা পড়েনি, আরেকটি হাটে সরকারি মূল্যের চেয়েও দর কম পড়েছে। তা ছাড়া কৌশলে হাটের নাম পরিবর্তন করে সিটি করপোরেশন থেকেই দর কমিয়ে ধরা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে ডিএনসিসির দুটি হাটে একটি করে দরপত্র জমা হয়েছে আর চারটিতে কোনো দরপত্রই পড়েনি। সব মিলিয়ে ঢাকার ৯টি হাট সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে।
যাত্রাবাড়ীর কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ী পর্যন্ত রাস্তার উভয় পার্শ্বের খালি জায়গা’ অস্থায়ী হাটের সরকারি মূল্য ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। আগের বছর এই হাটের সরকারি মূল্য ছিল ৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা। শুধু খাতা-কলমে ‘দনিয়া কলেজের পূর্ব পার্শ্বে ও সনটেক মহিলা মাদ্রাসার পূর্ব পশ্চিমের খালি জায়গা’ নামের পরিবর্তে ‘মাতুয়াইল মৃধাবাড়ী পর্যন্ত রাস্তার উভয় পার্শ্বের খালি জায়গা’ নাম নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে এ বছর এক কোটি টাকা কম মূল্যে টেন্ডার আহ্বান করে ডিএসসিসি।
হাজারীবাগের ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি কলেজের পূর্ব পার্শ্বের খালি জায়গা’ অস্থায়ী পশুর হাটের সরকারি মূল্য ছিল ৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এ বছর এই অস্থায়ী হাটটি কলেজের সামনে থেকে ‘শিকদার মেডিকেল কলেজসংলগ্ন আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের খালি জায়গা’তে স্থানান্তর করা হয়েছে। এতেই হাটটির ৭৪ লাখ টাকা কমে সরকারি মূল্য ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর হাটটি ৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকায় ইজারা যায়। এ বছর একই প্রতিষ্ঠান সরকারি মূল্যের চেয়ে মাত্র ১০ হাজার টাকা বেশি দিয়ে ইজারা নিয়েছে।
উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাবের খালি জায়গা’ পশুর হাটের গত বছরের সরকারি মূল্য ছিল ১ কোটি ৮২ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৪। চলতি বছর সরকারি মূল্য কমিয়ে ১ কোটি ৭৪ লাখ ৭২ হাজার ৩৩৪ টাকা করা হয়। সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা সিকদার কনস্ট্রাকশনের আনিসুর রহমান টিপু এ বছর ৩ কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন।
এদিকে ডিএনসিসির ১২টি হাটের মধ্যে ‘উত্তরা দিয়াবাড়ি ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টরসংলগ্ন বউবাজার এলাকার খালি জায়গা’ হাটে সর্বোচ্চ দর দিয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক এস এফ করপোরেশনের মালিক শেখ ফরিদ হোসেন। তিনি হাটটির জন্য সর্বোচ্চ ১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা দর দিয়েছেন।
মস্তুল চেকপোস্ট-সংলগ্ন পশ্চিমপাড়ার খালি জায়গা’ এবং ‘ভাটুলিয়া সাহেব আলী মাদ্রাসা থেকে ১০ নম্বর সেক্টর রানাভোলা অ্যাভিনিউ-সংলগ্ন উত্তরা রানাভোলা সøুইসগেট পর্যন্ত খালি জায়গা’ এ দুই হাটের জন্য একটি করে দরপত্র পেয়েছে ডিএনসিসি। এর মধ্যে ৯৩ লাখ ২২ হাজার টাকা মূল্যের মস্তুল হাটের জন্য বিল্লাল হোসেন নামের এক ব্যক্তি দর দিয়েছেন ৩ কোটি ৬০ হাজার টাকা। তবে রানাভোলা হাটের জন্য সরকার নির্ধারিত দর ৮৮ লাখ ২০ হাজার ৭৫০ টাকা। একমাত্র দরদাতা মেসার্স লামিয়া এন্টারপ্রাইজের নুর আলম দর দিয়েছেন ৮৮ লাখ টাকা।
খিলক্ষেত বাজারসংলগ্ন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচের খালি জায়গা, মেরুল বাড্ডা কাঁচাবাজার-সংলগ্ন খালি জায়গা, মোহাম্মদপুরের বছিলায় ৪০ ফুট রাস্তাসংলগ্ন খালি জায়গা এবং ভাটারা সুতিভোলা খাল অস্থায়ী হাটের জন্য কোনো দরপত্র জমা পড়েনি।
দরপত্র খোলার সময় ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমান সাংবাদিকদের বলেন, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি দরদাতাদের দেওয়া পে-অর্ডারসহ যাবতীয় নথিপত্র যাচাই-বাছাই করবে। কোনো হাটের দরপত্র নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের কোনো অভিযোগ থাকলে লিখিত দিতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী, যেসব হাটের জন্য কোনো দর পাওয়া যায়নি, সেগুলোর জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হবে।
দুই সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, তিন ধাপে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পশুর হাটের ইজারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। তা ছাড়া রাজধানীর দুই স্থায়ী পশুর হাট গাবতলী ও সরুলিয়াতে যথারীতি কোরবানির পশু কেনাবেচা হবে। সূত্র: দেশরূপান্তর
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব