আশিস গুপ্ত
ভারত ও বাংলাদেশ—দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র, যাদের ইতিহাসের একটি বড় অংশ পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র, যাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং রক্তের বন্ধন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হলেও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বরাবরই নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সক্রিয় ভূমিকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি নির্মাণ করে, কিন্তু এরপরের পাঁচ দশকে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল, জলসম্পদ ভাগাভাগি, বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা এবং অভ্যন্তরীণ জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রভাব এই সম্পর্ককে অনেক সময়েই জটিল করে তুলেছে।ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ব্যাকরণ আজও ভারসাম্যহীন। নয়াদিল্লি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে প্রায়শই ‘উন্নয়ন সহযোগিতা’ বা ‘নিরাপত্তা সংলাপ’-এর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখে, যেখানে বাংলাদেশকে একটি ছোটো, সহযোগী রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করা হয়—যার কাজ হচ্ছে ভারতের আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষা ও চীনের প্রভাব প্রতিহত করা। অথচ বাংলাদেশ, নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতায় ক্রমাগত উন্নীত একটি মধ্যম আয়ের রাষ্ট্র হিসেবে, ভারত থেকে চায় সমতার ভিত্তিতে অংশীদারিত্ব, কেবল কৃতজ্ঞতার রাজনীতি নয়।কাগজে কলমে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখেছে। ভারতের বিদেশনীতির লক্ষ্য বাংলাদেশের সঙ্গে একটি স্থিতিশীল ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক নিশ্চিত করা, যা সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংঘাত এবং অন্যান্য প্রধান শক্তির (বিশেষ করে চিনের প্রভাবের বিরুদ্ধে) একটি বাফার রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করবে। গত ৫৩ বছর ধরে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এগিয়েছে এই পথ ধরেই। ২০১৪ সালে ভারতে শাসকের পরিবর্তনেও এই উপমহাদেশের দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্কে চিড় ধরেনি। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে, ছোটখাটো কিছু সমস্যা দেখা দিলেও ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কে বৈরিতা ছিল না কখনওই। ধর্মীয় বিভাজনের মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল বা তা স্থায়ী করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ থেকে এদেশে ‘ক্রমবর্ধমান অনুপ্রবেশ’ বিজেপির অন্যতম অ্যাজেন্ডা হলেও নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যে কোনও সরকারি আলোচনায় বিষয়টি ইস্যু হয়ে ওঠেনি। আসলে ‘অনুপ্রবেশ’কে আলোচনার বিষয় করে ভারত বা বাংলাদেশ কেউই সম্পর্কে ফাটল ধরাতে চায়নি। বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিগত বছরগুলিতে চিনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে তুলেছিলেন, চিন্তায় ছিল ভারত। কিন্তু সেই চিন্তার প্রকাশ ঘটেনি ভারতের বিদেশমন্ত্রকের আচার-আচরণে। বরং উল্টোটাই হয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের বেশ কয়েকমাস আগে থেকেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগী পশ্চিমি দেশগুলি। তখন ভারত দফায় দফায় আলোচনা করে ওয়াশিংটনকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনও বড় পদক্ষেপ করা থেকে বিরত রেখেছিল। টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থাকার পর সম্প্রতি ছাত্র–জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘনিষ্ঠভাবে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে কাজ করে গেছেন। তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দেখে মনে হত, উভয়পক্ষই এর সমান সুফলভোগী।
কিন্তু হঠাৎ করেই, বাংলাদেশ সম্পর্কিত ভারতের বিদেশনীতি একটা বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বাংলাদেশে ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণঅভ্যুত্থান হঠাৎ-ই যেন এক সামুদ্রিক ঝড় হয়ে আছড়ে পড়েছে ভারত উপমহাদেশে। এক ঝড়ে গত পাঁচ দশক ধরে নানা চড়াই-উৎরাই পার করে গড়ে ওঠা ভারত-বাংলাদেশ সৌহার্দ্যের সৌধটা মাটিতে মিশে গেল! কেন? ‘৭১-এ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যে-দেশ তাদের সীমান্ত খুলে, মানবিক সাহায্য দিয়ে বাংলাদেশিদের জীবন বাঁচিয়েছিল; অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও সামরিক সাহায্য দিয়েছিল; এমনকি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি যুদ্ধ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনির হাত থেকে মুক্ত করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিল; আজ ৫৩ বছর পর কেন সে-দেশের মানুষের মধ্যে ভারত-বিরোধিতা এত প্রবল হয়ে উঠল? দুই দেশের আগামী দিনের সম্পর্ক ও বিদেশনীতির জন্য তার উত্তর খোঁজা জরুরি। গত কয়েকমাস ধরে সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে জনরোষের বিস্ফোরণ ঘটল। আন্দোলন শুরুর কিছুদিন পরই শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার অবসান হয়ে উঠল আন্দোলনের প্রধান দাবি। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল গোটা দেশে। প্রবল আন্দোলনের মুখে, সেনাবাহিনির পরামর্শে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিলেন। শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং দেশ ছেড়ে যাওয়া ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক মহলের কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত। হাসিনা যতদিন ক্ষমতায় ছিলেন, ততদিন তাঁকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে গেছে ভারত। এই সমর্থন দিতে গিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে উপেক্ষা করেছে ভারত। মোদির নেতৃত্বে ভারত সরকার শুধু বাংলাদেশ নয়, বেশিরভাগ প্রতিবেশী দেশের ক্ষেত্রে এমন অবস্থান নিয়ে চলেছে। যেমন মায়ানমার। সেখানে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার ভেঙে দিয়ে ক্ষমতা দখল করা সামরিক শাসককে সমর্থন দিয়ে চলেছে দিল্লি। সামরিক সরকার গণতন্ত্র ফেরানোর দাবিতে চলমান গণআন্দোলনের নেত্রী অং সান সু চি-সহ হাজার হাজার মায়ানমার নাগরিককে কারাবন্দি করে রেখেছে। সেনার দমনপীড়ন থেকে রক্ষা পেতে সেখানকার মানুষ শহর ছেড়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক সরকারের পক্ষ নিয়ে গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভ দমনে ভূমিকা রেখেছে ভারত। আফগানিস্তানে তালিবান আবার ক্ষমতায় ফেরার পর গোষ্ঠীটির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারতের কাছে উপেক্ষিত থেকেছে দেশগুলির সাধারণ জনগণ।
শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের মিত্রতার সম্পর্কের শিকড় অনেক গভীরে হলেও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত বিষয়গুলির সমাধান হয়নি।২০১১ সালে তিস্তা জলবণ্টন চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তিতে তা ঝুলে থাকে। এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ভারত এই সংকট সমাধানে কার্যকর কোনও উদ্যোগ নেয়নি। অথচ তিস্তার পানির ওপর বাংলাদেশের রংপুর ও কুড়িগ্রাম অঞ্চলের কৃষি ও খরা-প্রবণ জীবনযাত্রা নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক জলনীতি অনুযায়ী, অভিন্ন নদীর পানি ভাগাভাগির ক্ষেত্রে উজান ও ভাটির দেশগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা ও ন্যায়সঙ্গত বণ্টনের নীতি থাকা উচিত। কিন্তু ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে এবং তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে অজুহাত বানিয়ে বাংলাদেশকে প্রতিশ্রুত পানি সরবরাহে ব্যর্থ হয়। ২০২২ সালের তথ্যানুসারে, গ্রীষ্ম মৌসুমে তিস্তা দিয়ে প্রবাহিত পানির মাত্র ২৫–৩০ শতাংশই বাংলাদেশের দিকে প্রবাহিত হয়, যেখানে প্রয়োজন ছিল ৫০ শতাংশের বেশি (Rahman, A. T. R., 2022)।এই নদী ইস্যুর সঙ্গে সম্পৃক্ত আরও একটি প্রশ্ন হলো সীমান্ত হত্যা। বিএসএফ কর্তৃক সীমান্তে গুলি চালিয়ে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা একটি দীর্ঘস্থায়ী ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। ২০২০ সালে সীমান্তে নিহতের সংখ্যা ছিল ৫১ জন, এবং ২০২৩ সালেও তা একক সংখ্যায় কমেনি (Human Rights Watch, 2021)। ভারত যদিও ২০১০ সালে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা ‘অ-প্রাণঘাতী অস্ত্র’ অস্ত্র ব্যবহার করবে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনও বাংলাদেশি গরিব কৃষক বা শ্রমজীবী মানুষ ‘সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘পাচারকারী’ পরিচয়ে গুলিবিদ্ধ হচ্ছে। এই হত্যাকাণ্ড শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার আন্তর্জাতিক প্রটোকলকেও লঙ্ঘন করে।
বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও ভারসাম্যহীনতা প্রকট। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ১১.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারত বাংলাদেশে রপ্তানি করেছে প্রায় ১৩.৬৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, অথচ বাংলাদেশ ভারতকে রপ্তানি করেছে মাত্র ২.০৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য (Bangladesh Bank, 2023)। এই অসমতা শুধু পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নীতিগতভাবে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশে নানা অশুল্ক বাধা রয়েছে, যা বাংলাদেশের উদ্যোগপতিদের জন্য অসুবিধাজনক। বাংলাদেশের কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক ও ওষুধশিল্প ভারতে প্রবেশ করতে গিয়ে নিয়মিত বাধার সম্মুখীন হয়, যা ‘উন্মুক্ত বাজার নীতি’র আদর্শ পরিপন্থী।সম্প্রতি এই সম্পর্ক আরও টানাপোড়েনের মুখে পড়েছে চীন-ভারত দ্বন্দ্বের কারণে। বাংলাদেশ এখন চীনের অন্যতম বৃহৎ ঋণগ্রহীতা। দেশের অভ্যন্তরে অবকাঠামো ক্ষেত্রে অন্যতম বিনিয়োগকারী রাষ্ট্রও চীন । চীন ২০১৬ সালে বাংলাদেশকে ২৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ প্রতিশ্রুতি দেয়, যার একটি বড় অংশ ইতিমধ্যে বাস্তবায়নাধীন (The Diplomat, 2023)। ভারতের দৃষ্টিতে এটি কৌশলগত হুমকি, কিন্তু বাংলাদেশের দৃষ্টিতে এটি বিকল্প অংশীদারিত্বের অভিমুখ। যদি ভারত বাংলাদেশের প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ও অতিরিক্ত শর্ত আরোপ না করত, তাহলে বাংলাদেশের ‘বিকল্প খোঁজা’ প্রয়োজন হতো না। বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে তার জাতীয় স্বার্থেই বহুমুখী কূটনীতিতে যেতে বাধ্য হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের একতরফা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হচ্ছে। সীমান্ত হত্যা, পানি সংকট, বাণিজ্যিক শোষণ এবং রাজনৈতিক চাপ নিয়ে যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে, তা বিরোধী দলগুলো এবং তরুণ সমাজের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি করেছে। ফলে, এক সময় যে ‘চিরবন্ধু’ পরিচয়ে ভারত স্বীকৃত ছিল, এখন সেখানে সন্দেহ ও ক্ষোভ বাড়ছে।সম্প্রতি ভারতের ঘরোয়া রাজনীতিতে বাংলাদেশবিরোধী সাম্প্রদায়িক প্রচারও সম্পর্ককে ক্ষুণ্ণ করছে। বিশেষত নির্বাচনী মৌসুমে বিজেপি নেতাদের বক্তব্যে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’, ‘জিহাদি শরণার্থী’ ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার কেবল ঘৃণার রাজনীতিকেই উসকে দেয় না, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ভিত্তিকেও আঘাত করে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বিজেপি সভাপতি জে.পি. নাড্ডা পশ্চিমবঙ্গের জনসভায় সরাসরি বলেন, “বাংলাদেশ থেকে মুসলমান অনুপ্রবেশে বাংলার চরিত্র বদলে যাচ্ছে।” এ ধরনের বক্তব্য শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসাধনের জন্য হলেও, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তা বাংলাদেশকে অসম্মান করে।ঝাড়খণ্ড বিধানসভা নির্বাচন ২০২৪-এর প্রচারণার সময় বিজেপি শীর্ষ নেতাদের ভাষণে বাংলাদেশ থেকে "অবৈধ অনুপ্রবেশ" এবং সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়গুলো প্রায়ই উত্থাপিত হয়েছে, যা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে। এই ধরনের বক্তব্য সাধারণত ভোটারদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আবেগ জাগানোর জন্য ব্যবহৃত হয়, কূটনৈতিক সম্পর্কের টোক্কা না করেই।
বিজেপির প্রচারণায় ঝাড়খণ্ডের মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে "অবৈধ অনুপ্রবেশ" একটি প্রধান ইস্যু হিসেবে উঠে আসে। নির্বাচনের সময় বিজেপি নেতারা, যেমন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বা কেন্দ্রীয় গৃহমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রায়ই অভিযোগ করেন যে বিরোধী দলগুলো অবৈধ অভিবাসীদের সমর্থন করে, যা স্থানীয় জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এই বক্তব্যে সরাসরি বাংলাদেশের নাম উল্লেখ না করলেও, ঝাড়খণ্ডের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে অমিত শাহ সাঁওতাল পরগনা অঞ্চলে একটি সমাবেশে বলেছিলেন, “বিজেপি ক্ষমতায় এলে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে রাজ্য থেকে বের করে দেওয়া হবে।” এই বক্তব্যে বাংলাদেশের নাম সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও, স্থানীয় প্রেক্ষাপটে এটি বাংলাদেশি অভিবাসীদের দিকে ইঙ্গিত করে বলে ধরে নেওয়া হয়।এছাড়া, ঝাড়খণ্ডের নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি নেতারা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা বাংলাদেশ থেকে আগত সংখ্যালঘুদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে ছিল। এই নীতি বাংলাদেশে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ এটি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ইস্যুকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করে বলে অভিযোগ উঠেছে। যেমন, ২০১৯ সালে ভারতীয় সংসদে সিএএ পাসের সময় বিজেপি নেতারা দাবি করেছিলেন যে বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর নিপীড়নের কারণে তাদের ভারতে আশ্রয় দেওয়া প্রয়োজন। এই ধরনের বক্তব্য ২০২৪ সালের ঝাড়খণ্ড নির্বাচনেও প্রতিধ্বনিত হয়েছে।একটি সম্পর্কিত ঘটনা হলো, ২০১৮ সালে ভারতীয় সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াতের বক্তব্য, যিনি দাবি করেছিলেন যে চীনের সহায়তায় পাকিস্তান বাংলাদেশি মুসলমানদের ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পাঠাচ্ছে। এই বক্তব্যে বিজেপি-শাসিত আসামের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল, এবং এটি ঝাড়খণ্ডের মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যেও প্রভাব ফেলেছিল। এই ধরনের বক্তব্য বর্তমান ভারতীয় শাসকদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতি ধর্মের আঁধারে সৃষ্ট বৈরিতার মানসিকতাকে প্রতিফলিত করে।বিজেপির প্রচারণায় অবৈধ অনুপ্রবেশ ও NRC-এর মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশের প্রতি পরোক্ষভাবে নেতিবাচক বার্তা দেয়। এই বক্তব্যগুলো বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাব বাড়াতে ভূমিকা রাখে, কারণ এগুলো প্রায়ই অতিরঞ্জিত বা ভুল তথ্যের ভিত্তিতে প্রচারিত হয়।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ ভারতের রাজনৈতিক ভাষ্য ও কূটনৈতিক প্রচারে একটি পুনরাবৃত্ত উপাদান হয়ে উঠেছে। বিশেষত যখন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ে কিংবা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন এই অভিযোগ নতুন করে উচ্চারিত হয়। ভারতের মিডিয়া, হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক শক্তি এবং কখনো কখনো কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, ধর্মান্তরের চাপ, এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলার অভিযোগ তোলে। কিন্তু এই অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি কতটা? এবং ভারত নিজেই সংখ্যালঘু অধিকারের প্রশ্নে কতটা নৈতিক উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আছে—এ প্রশ্নগুলো গুরুত্ব সহকারে বিচারযোগ্য।বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ হলো হিন্দু সম্প্রদায়, যারা বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৭.৯৫% (BBS, Population and Housing Census 2022)। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে এই হার ক্রমহ্রাসমান, যদিও এর পেছনে কেবল নিপীড়ন নয়, বরং অর্থনৈতিক অভিবাসন, শিক্ষা-চাকরির সুযোগের খোঁজে দেশত্যাগ এবং পারিবারিক পুনর্মিলনের মতো বহুবিধ কারণ বিদ্যমান। তবু, বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ঘটে এবং তা অনেক সময় ধর্মীয় উগ্রবাদ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিংবা জমি দখলের মতো অপপ্রয়োজনে ঘটানো হয়।বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ হলো হিন্দু সম্প্রদায়, যারা বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৭.৯৫% (BBS, Population and Housing Census 2022)। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে এই হার ক্রমহ্রাসমান, যদিও এর পেছনে কেবল নিপীড়ন নয়, বরং অর্থনৈতিক অভিবাসন, শিক্ষা-চাকরির সুযোগের খোঁজে দেশত্যাগ এবং পারিবারিক পুনর্মিলনের মতো বহুবিধ কারণ বিদ্যমান। তবু, বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ঘটে এবং তা অনেক সময় ধর্মীয় উগ্রবাদ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিংবা জমি দখলের মতো অপপ্রয়োজনে ঘটানো হয়।তবে এই চিত্রের পাশাপাশি অন্য একটি বাস্তবতাও রয়েছে—রাষ্ট্রীয়ভাবে সংখ্যালঘুদের রক্ষায় আইন, সংস্থা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার উপস্থিতি। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের জন্য মন্দিরভিত্তিক শিক্ষা প্রকল্প, সংখ্যালঘু কল্যাণ ট্রাস্ট, দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি অনুদান, এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ চলমান। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংখ্যালঘু ভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। বিশেষত হিন্দু ভোটাররা গ্রামীণ ভোটব্যাংকে বিরাট ভূমিকা রাখায় সরকারের ভেতরে সংখ্যালঘুবান্ধব অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।
অপরদিকে ভারতের অবস্থান তুলনায় জটিল। একদিকে তারা বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে উচ্চকণ্ঠ, অপরদিকে নিজেদের দেশে সংখ্যালঘু, বিশেষত মুসলিম, খ্রিস্টান ও দলিতদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও বৈষম্যের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে। ২০১৯ সালে পাস হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) মুসলিমদের বাদ দেওয়ার লক্ষ্যে পরিকল্পিত আইন হিসেবে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে। ২০২০ সালে দিল্লিতে মুসলিম-বিরোধী দাঙ্গায় ৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন, যার বেশিরভাগই মুসলিম। ২০২৩ সালে হরিয়ানায় মেওয়াট ও নুহ এলাকায় মুসলিম ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে বুলডোজার চালানো হয় বিজেপি নেতাদের সমর্থনে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু পরিস্থিতি কোনো নিখুঁত বা সহিংসতামুক্ত নয়—এখানে সমস্যা আছে, প্রশাসনিক দুর্বলতা আছে, এমনকি রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধীদের রক্ষার উদাহরণও আছে। তবে এটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত কোনও জেনোসাইড বা ধর্মীয় নিধন অভিযান বলা চলে না। বরং বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষায় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলেছে, যদিও তার প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে। অপরদিকে ভারতের পক্ষে বাংলাদেশকে এই প্রশ্নে নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার অবস্থান, তার নিজের অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, রাজনৈতিক উস্কানি ও মুসলিমবিরোধী আইনপ্রণয়ন বিবেচনায় দুর্বল ও দ্বিচারিতাপূর্ণ।এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সংখ্যালঘু বিষয়ক পারস্পরিক স্বচ্ছতা, তথ্য বিনিময় ও গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল আচরণ। দুই দেশই যদি সংখ্যালঘু নিরাপত্তার বিষয়ে আন্তরিক হয়, তবে তাতে কূটনৈতিক উত্তেজনা নয়, বরং যৌথ মানবিক উদ্যোগ গড়ে উঠবে। রাজনৈতিক সুবিধাবাদের জায়গায় দাঁড়িয়ে একে অপরকে দায়ী করলে বন্ধুত্ব ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আসলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।নতুন এই বাংলাদেশকে গতানুগতিক পুরনো কূটনীতিক মন দিয়ে সঠিকভাবে বোঝা যাবে না। বরং কোনও বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর বদলে ভারতের উচিত দ্রুত বাংলাদেশের জনমানসে নিজের স্থান করে নেওয়া। বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকার যেভাবে বিগত বছরগুলোতে ভারতের কংগ্রেস-বিজেপি-জনতা সরকারের সঙ্গে কাজ করতে অভ্যস্ত ছিল, ভারতকেও একইভাবে প্রতিবেশী দেশের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে চলতে অভ্যস্ত হতে হবে। বিশেষত তরুণসমাজের চাওয়া-পাওয়াকে বুঝতে চেষ্টা করা, মর্যাদা দেওয়া। এটাই হল নয়াদিল্লির দিক থেকে ইতিমধ্যে ঘটে যাওয়া বিপত্তি থেকে বের হওয়ার পথ। বন্ধুত্বের বাস্তবিক অর্থ তখনই হয়, যখন তা সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে গঠিত হয়। ভারত যদি বাংলাদেশকে কেবল ‘ছোট ভাই’ হিসেবে দেখে, তবে এই সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে টিকবে না। অপরদিকে, বাংলাদেশেরও উচিত আত্মমর্যাদার ভিত্তিতে কূটনীতি চর্চা করা এবং সব পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে কৌশলগত পথচলা নিশ্চিত করা।পঞ্চাশ বছর পর এই সম্পর্ককে আর ১৯৭১ সালের স্মৃতির বোঝায় টানলে চলবে না। বরং বর্তমান বাস্তবতা, অভিন্ন স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে দুই রাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবতে হবে—বন্ধুত্ব কীভাবে সমতা অর্জন করে।
লেখক, ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক। এবং সভাপতি, সাউথ এশিয়ান ক্লাইমেট চেইঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম (সাকজেএফ)