শিমুল চৌধুরী ধ্রুব: এক কোটির বেশি বাংলাদেশি বিদেশে শরীরের রক্ত পানি করা শ্রম আর ঘামে অর্জিত অর্থ প্রতি মাসে নানান মাধ্যমে দেশে পাঠান। ওই টাকার মধ্যে বৈধ পথে পাঠানো রেমিটেন্সই মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার বড় একটি অংশ। রপ্তানীর পর প্রবাসী আয়ই বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম বড় উৎস। যদিও এই আয় নানান অবৈধ চ্যানেল তথা হুন্ডির কারণে শুরু থেকেই বাধাগ্রস্থ। সেসব বাধা কাটাতে বেশ কয়েক বছর ধরেই সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে নানান উদ্যোগ। সেগুলোর কিছু বাস্তবায়ন হয়েছে, কিছু হয়নি। এরমধ্যেই প্রবাসীদের কাছ থেকে আসা রেমিট্যান্সের ওপর কর আরোপের পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
আইএমএফ’র এমন পরামর্শ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নতুন শঙ্কা। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি প্রবাসী আয়ের ওপর কর আরোপ করা হয় তাহলে দেশের রেমিটেন্স আশঙ্কাজনক হারে কমে যাবে। প্রবাসীরা তাদের কষ্টের অর্থ দেশে পাঠাতে দ্বারস্থ হবেন হুন্ডির।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সুপারিশ নিয়ে পর্যালোচনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না বলে জানা গেছে। রাজস্ব বোর্ডের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, রেমিট্যান্সের ওপর করারোপ করলে এর কী প্রভাব পড়বে এবং এর যৌক্তিকতা নিয়ে পর্যালোচনা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩০.৩২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে, যা এর আগের অর্থবছরের তুলনায় ২৬.৮০ শতাংশ বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৩.৯১ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন মাসেও প্রবাসীরা সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। ডলার সংকট কাটাতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে যখন সরকারের উদ্যোগ চলছে তখনই আইএমএফের এমন শর্তে উদ্বিগ্ন প্রবাসীরা এর ফলে প্রবাসী আয়ে নেতিবাচক প্রবাহ সৃষ্টি করতে পারে।
এ বিষয়ে এনবিআরের করনীতি বিভাগের সদস্য ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, ‘আইএমএফের রেমিট্যান্সের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব গ্রহণ করার কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। তারা অনেক কিছুই প্রস্তাব করে। আমাদের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অনেক সময় অনেক কিছুই গ্রহণ করার মতো অবস্থা থাকে না। জাতীয় স্বার্থ মাথায় রাখতে হবে।’
গত বছর ডলার সংকটে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপে পড়ে। আমদানি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এ সময় চাপ সামলাতে প্রণোদনা বৃদ্ধিসহ বৈধপথে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়াতে সরকার নানা ধরনের উদ্যোগ নেয়। দেশে প্রবাসী আয় পাঠাতে কাগজপত্র দেখানোর বাধ্যবাধতা শিথিল করার পাশাপাশি রেমিট্যান্সের প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রে পাঠানো অর্থের পরিমাণও বৃদ্ধি করা হয়। এসব উদ্যোগের ফলে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ পর্যন্ত প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে।
আইএমএফের রেমিট্যান্সের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘আমাদের মতো দেশে আপাতত এটা সম্ভবও না। আমাদের ব্যালান্স অব পেমেন্ট ও রিজার্ভে সমস্যা আছে। আগে এগুলো ঠিক করে আদর্শ পরিস্থিতি তৈরি হলে এটা সম্ভব। এখন আইএমএফ চাইলেও আমরা রাজি হব না।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন প্রবাসী আয়ে করারোপ করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। টান পড়তে পারে প্রবাসী আয়ে। ফলে আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান আইএমএফ যাই বলুক আপাতত এ পথে হাঁটার কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব