| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

গণমাধ্যম অবক্ষয়ের এক রূঢ় বাস্তবতা

সাংবাদিকরাই ঢুকছে রাজনীতিবিদদের পকেটে?

reporter
  • আপডেট টাইম: ডিসেম্বর ০১, ২০২৫ ইং | ১২:৪৮:১৩:অপরাহ্ন  |  ১০৮২৯০০ বার পঠিত
সাংবাদিকরাই ঢুকছে রাজনীতিবিদদের পকেটে?
ছবির ক্যাপশন: ছবি: এস এম ফয়েজ

এস এম ফয়েজ 

গণতন্ত্রের প্রহরী হিসেবে পরিচিত গণমাধ্যম আজ নিজেই প্রশ্নের মুখে। যে ‘চতুর্থ স্তম্ভের’ কাজ ছিল ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, সেই স্তম্ভের কর্মীরাই কি তবে ক্ষমতার অলিন্দে আত্মসমর্পণ করছেন? ‘সাংবাদিকরাই ঢুকছে রাজনীতিবিদদের পকেটে?’ এই প্রশ্নটি এখন কেবল চায়ের দোকানের আড্ডায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের এক গভীর উদ্বেগ। এই অভিযোগের পেছনে লুকিয়ে আছে গণমাধ্যমের পেশাদারিত্বের অবক্ষয় এবং একুশ শতকের নতুন বাস্তবতা।

অবক্ষয়ের মূল কারণ: কর্পোরেট স্বার্থ ও মালিকানার পরিবর্তন: বেশিরভাগ মূলধারার সংবাদমাধ্যমের মালিকানা এখন বড় বড় কর্পোরেট হাউস বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে। তাদের প্রধান লক্ষ্য জনস্বার্থ নয়, বরং ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করা। যখন একজন সাংবাদিক কোনো প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ বা ব্যবসায়ীর দুর্নীতি নিয়ে কাজ করতে যান, তখন মালিকপক্ষের চাপ আসে। টিকে থাকার তাগিদে সাংবাদিক বাধ্য হন খবরটি চেপে যেতে, অথবা মালিকের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে। এখানে সাংবাদিক পকেটে ঢোকেন না, বরং পকেটে ঢুকতে বাধ্য হন।

অর্থনৈতিক প্রলোভন ও ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা: নৈতিকতার স্খলন আজকের দিনে এক বড় সমস্যা। কিছু সাংবাদিক ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়ে ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা লাভে আগ্রহী হন। সরকারি প্লট, বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা চিকিৎসা সুবিধা, কিংবা ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক পদ এই লোভগুলো একজন সাংবাদিকের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। যখন একজন সাংবাদিক নিজের পেশাগত পরিচয় ভুলে রাজনীতিবিদদের 'পিআর (পাবলিক রিলেশন্স) ম্যানেজার' হিসেবে কাজ শুরু করেন, তখন পুরো পেশার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়।

ভয়ের সংস্কৃতি ও  সেলফ-সেন্সরশিপ: সরকারের দমনমূলক মনোভাব এবং আইনি জটিলতা অনেক সাহসী সাংবাদিককে কোণঠাসা করে দিয়েছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এখন একটি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। মামলার ভয়, শারীরিক আক্রমণের শঙ্কা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের চাপ অনেককে আপস করতে বাধ্য করছে। ফলস্বরূপ, সাংবাদিকরা নিজেরাই নিজেদের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করেন এবং নিরাপদ ও সরকার-ঘনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনকেই শ্রেয় মনে করেন।

হলুদ সাংবাদিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট: কিছু সংবাদমাধ্যম টিআরপি বা ক্লিক বাড়াতে ভিত্তিহীন ও হলুদ সাংবাদিকতাকে হাতিয়ার করেছে। এতে মূলধারার বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রতিও মানুষ আস্থা হারাচ্ছে। এই সুযোগে রাজনীতিবিদরা গণমাধ্যমকে সহজেই 'পক্ষপাতদুষ্ট' বা 'ভুয়া খবর পরিবেশনকারী' হিসেবে আখ্যায়িত করার সুযোগ পাচ্ছেন।

সাহসী ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা: অনেক প্রতিকূলতার মাঝেও বহু সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম সাহসিকতার সাথে নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করে যাচ্ছেন। তাদের অনুসন্ধানী রিপোর্ট জনস্বার্থ রক্ষা করছে।

ডিজিটাল ও স্বাধীন প্ল্যাটফর্মের উত্থান: মূলধারার গণমাধ্যমের বাইরে সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব চ্যানেল এবং স্বাধীন অনলাইন পোর্টালগুলো ভিন্নমত ও নিরপেক্ষ সংবাদ প্রকাশের সুযোগ তৈরি করছে, যা ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়া সাংবাদিকদের বিপরীতে একটি ভারসাম্য তৈরি করছে।

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা: সাংবাদিক ইউনিয়ন বা পেশাদার সংগঠনগুলো অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের স্বার্থ রক্ষায় যথেষ্ট শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে না, যার ফলে ব্যক্তি সাংবাদিক চাপের মুখে একা হয়ে পড়েন।

সাংবাদিকরা ঢালাওভাবে রাজনীতিবিদদের পকেটে ঢুকছেন এই অভিযোগটি পুরো পেশাজীবী সম্প্রদায়ের জন্য অপমানজনক। তবে, এই অভিযোগের ভিত্তি যে একেবারেই নেই, তা নয়। বরং, প্রতিষ্ঠানিক চাপ, ভয়ের সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিগত নৈতিকতার স্খলন এই সবকিছুর মিশেলে গণমাধ্যম আজ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে।

গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে গণমাধ্যমকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ থাকতে হবে। সাংবাদিকদের নিজেদেরও লোভ ও ভয়কে জয় করে পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত না গণমাধ্যম নির্ভয়ে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারছে, ততক্ষণ ‘পকেটে ঢোকার’ এই অভিযোগ পিছু ছাড়বে না।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪