এস এম ফয়েজ
ডিজিটাল যুগে তথ্য এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু এই সুবিধার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে এক অদৃশ্য বিপদ ভুয়া খবর বা গুজব। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, একটি সংঘবদ্ধ মহল অত্যন্ত সুকৌশলে দেশের প্রতিষ্ঠিত ও বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যমগুলোর নাম, লোগো এবং নিউজ কার্ড হুবহু নকল করে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য ছড়াচ্ছে। এই ‘ডিজিটাল মাস্করেড’ (উরমরঃধষ গধংয়ঁবৎধফব) সাধারণ মানুষকে চরম বিভ্রান্ত করছে এবং সমাজে অস্থিরতা তৈরি করছে।
গুজব ছড়ানোর অভিনব কৌশল ও উদ্দেশ্য
প্রচলিত ধারণা বদলে এখন পেশাদার গ্রাফিক্স ডিজাইনারদের দিয়ে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের লোগো, ফন্ট এবং বিন্যাস (ষধুড়ঁঃ) নকল করে ভুয়া নিউজ কার্ড তৈরি করা হচ্ছে। এই কৌশল ব্যবহার করার মূল উদ্দেশ্য হলো, সাধারণ মানুষের মনে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা। যখন কোনো মিথ্যা তথ্য একটি পরিচিত গণমাধ্যমের নামে ছড়ানো হয়, তখন তা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল বা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টির মতো নানা কারণে এই জঘন্য কাজটি করা হচ্ছে।
এই চক্রটি অত্যন্ত সুকৌশলে দেশের প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমগুলোর গ্রাফিক্স ডিজাইন অনুসরণ করে আকর্ষণীয় ও চটকদার শিরোনাম দিয়ে ভুয়া নিউজ কার্ড তৈরি করে। অনেক সময় চলমান কোনো আলোচিত ঘটনার সঙ্গে মিথ্যা তথ্য জুড়ে দিয়ে সত্যের আদলে তা পরিবেশন করা হয়। সাধারণ মানুষ দ্রুত খবরের উৎসের সত্যতা যাচাই না করেই তা শেয়ার করছেন, ফলে মূহুর্তেই গুজব ছড়িয়ে পড়ছে।
ভুয়া খবরের পেছনের মনস্তত্ত্ব
মানুষ স্বভাবতই চটকদার বা আবেগপ্রবণ খবরে দ্রুত আকৃষ্ট হয়। ভুয়া নিউজ কার্ডগুলো ঠিক এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগায়। যখন একটি মিথ্যা তথ্য প্রথম আলো, ডেইলি স্টার বা অন্য কোনো পরিচিত মাধ্যমের আদলে পরিবেশিত হয়, তখন অনেকেই উৎসের সত্যতা যাচাই না করেই তা বিশ্বাস করে এবং শেয়ার করে। এই দ্রুত শেয়ারিংয়ের ফলে মুহূর্তেই গুজব ভাইরাল হয়ে যায় সত্য খবরের চেয়েও দ্রুতগতিতে। এর পেছনে উদ্দেশ্য থাকে বহুমুখী; কখনো রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল, কখনোবা সাম্প্রদায়িক উসকানি, আবার কখনো নিছক ব্যক্তিগত আক্রোশ বা ক্লিক বাণিজ্য (যত ভিউ তত টাকা)।
গণমাধ্যম ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের মত
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, এই সমস্যার সমাধানে সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। পাঠকদের অবশ্যই যেকোনো খবর শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করতে হবে। নির্ভরযোগ্য ও আসল খবর পেতে, সরাসরি প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ভিজিট করা বা তাদের যাচাইকৃত ফেসবুক পেজ অনুসরণ করা উচিত।
নাগরিক দায়িত্ব
যেকোনো খবর শেয়ার করার আগে অবশ্যই তার উৎস (ংড়ঁৎপব) যাচাই করতে হবে। প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট বা যাচাইকৃত ফেসবুক পেজ থেকে খবরটি প্রকাশিত হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলোর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
আইনি পদক্ষেপ
ভুক্তভোগীরা যেন নির্ভয়ে অভিযোগ করেন, সে বিষয়ে আস্থা তৈরি করতে হবে। সাইবার অপরাধের শিকার হলে বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ক্রাইম হেল্প ডেস্কে অথবা ৯৯৯ হটলাইনে অভিযোগ জানানো সম্ভব।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ
জাতীয়ভাবে একটি শক্তিশালী জনসচেতনতামূলক অভিযান (ঢ়ঁনষরপ ধধিৎবহবংং পধসঢ়ধরমহ) প্রয়োজন, যা ফেক নিউজের ভয়াবহতা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করবে।
সামাজিক প্রভাব ও আস্থার সংকট
এই ফেক নিউজের দৌরাত্ম্য সমাজে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এটি মানুষের মধ্যে মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে, সামাজিক সহিংসতা উসকে দিচ্ছে এবং নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে জনআস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। যখন মানুষ আসল ও নকল খবরের মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়, তখন পুরো সংবাদ ব্যবস্থার ওপরই তাদের আস্থা নষ্ট হয়।
গুজব একটি সামাজিক ব্যাধি। আসল গণমাধ্যমের নিউজ কার্ড নকল করে ছড়ানো ফেক নিউজ এই ব্যাধিকে আরও প্রাণঘাতী করে তুলেছে। এই ডিজিটাল বিভ্রম থেকে বাঁচতে হলে আমাদের প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে এবং দায়িত্বশীল নাগরিকের ভূমিকা পালন করতে হবে। গণমাধ্যম, সরকার এবং সচেতন জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই কেবল পারে এই অন্ধকার দূর করতে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
রিপোর্টার্স২৪/এসসি