স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশের রাজনীতির এক প্রতীক, বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
গৃহবধূ থেকে রাজনৈতিক জীবনের শুরু করা খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন। স্বামী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হারানোর শোকের মধ্যেও তিনি দলটির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং একই বছর বর্ধিত সভায় প্রথম রাজনৈতিক ভাষণ দেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে কাউন্সিলের মাধ্যমে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এরপর মৃত্যুর দিন পর্যন্ত দলের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
চেয়ারপারসন হিসেবে তার নেতৃত্বে বিএনপি ১৯৮৩ সালে সাত-দলীয় জোট গঠন করে জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম শুরু করে। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ে খালেদা জিয়া একটুও আপস করেননি। নানা নিষেধাজ্ঞা ও অন্তরীণ থাকার মধ্যেও তিনি আন্দোলন চালিয়ে যান।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ ছিল। নব্বইয়ের গণআন্দোলন, ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গ্রেপ্তার এবং দীর্ঘ কারাবাস সব কিছুকে তিনি সামলে ওঠেন। এই সময়েই তার মা ও ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো’র মৃত্যু, তার বিরুদ্ধে আগুন সন্ত্রাসের অভিযোগসহ নানা চ্যালেঞ্জ সামলেছেন তিনি।
বঙ্গবন্ধু-যুগের শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, খালেদা জিয়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তিনি কখনো নির্বাচনে হেরে যাননি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনটি সাধারণ নির্বাচনে প্রতিবারই একাধিক আসন থেকে জয়ী হয়েছেন।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই বিএনপি ১৯৯১ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার থেকে সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার প্রবর্তন হয় তার নেতৃত্বে। ১৯৯৬ সালে এক মাসের জন্য ষষ্ঠ সংসদে প্রধানমন্ত্রী থাকেন, এরপর বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে আবারও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন।
২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং প্রায় এক বছর কারাগারে কাটান। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর বিরোধী দলীয় নেতা হন। ২০১৮ ও ২০২০ সালে দুদকের মামলায় কারাগারে থাকার পর শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান। ২০২৫ সালের আগস্টে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাবলে দণ্ডমুক্ত হন এবং সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পান।
ব্যক্তিগত জীবনেও খালেদা জিয়ার জীবন সংগ্রামপর্ব স্মরণযোগ্য। ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলার জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ব্যবসার কারণে দিনাজপুরে বসবাস শুরু করেন। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে খালেদা তৃতীয়। ১৯৬০ সালে তিনি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ে করেন। দুই সন্তান—তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় চার দশক ধরে তিনি একজন প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত। তার রাজনৈতিক যাত্রা কখনো নির্বাচন হারের ছায়ায় অন্ধকারায়িত হয়নি।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম