আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালালে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে এমন হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কয়েক দিনের বিক্ষোভে ইতোমধ্যে একাধিক প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এই অস্থিরতা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’ অবস্থায় রয়েছে এবং প্রয়োজনে ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। ওই সময় ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বিতভাবে পরিচালিত অভিযানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও সামরিক নেতৃত্ব লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
ট্রাম্পের মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তা ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানি বলেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এর পরিণতি মার্কিন সেনাদেরও ভোগ করতে হতে পারে। ইরান ইতোমধ্যে লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনে বিভিন্ন মিত্র ও প্রভাববলয়ের গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে আসছে।
এদিকে পশ্চিম ইরানের একটি অঞ্চলের স্থানীয় প্রশাসনের বরাতে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অবৈধ জমায়েত ‘কঠোরভাবে ও বিন্দুমাত্র ছাড় না দিয়ে’ দমন করা হবে। এতে পরিস্থিতি আরও সহিংস হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মূলত মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অব্যাহত দরপতনের প্রতিবাদে শুরু হওয়া এ বিক্ষোভ এখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও আকারে এটি আগের কয়েকটি গণঅভ্যুত্থানের তুলনায় ছোট, তবে পশ্চিমাঞ্চলগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে পরিস্থিতি প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে। রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, বুধবার থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য ছিলেন বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।
২০২২ সালে পুলিশ হেফাজতে এক তরুণীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানকে অচল করে দিয়েছিল, তার পর এটিই সবচেয়ে বড় আন্দোলন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। তখন মানবাধিকার সংগঠনগুলো শতাধিক মৃত্যুর অভিযোগ তুলেছিল।
বিক্ষোভের ভিডিও ফুটেজ যাচাই করে রয়টার্স জানিয়েছে, একটি এলাকায় জ্বলন্ত পুলিশ স্টেশনের সামনে মানুষ জড়ো হয়ে সরকারবিরোধী স্লোগান দিচ্ছিল, এ সময় গুলির শব্দও শোনা যায়। দক্ষিণের জাহেদান শহরে বিক্ষোভকারীরা ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক’ স্লোগান দিয়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হেঙ্গাও। সংস্থাটি জানিয়েছে, এ পর্যন্ত অন্তত ২৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের বড় একটি অংশ কুর্দি জনগোষ্ঠীর।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ট্রাম্প কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু বলা হয়নি। তবে ওয়াশিংটন জানিয়েছে, তেহরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি অব্যাহত থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরানি কর্তৃপক্ষ জনগণের কল্যাণে ব্যয় না করে বিপুল অর্থ সশস্ত্র গোষ্ঠী ও পারমাণবিক গবেষণায় অপচয় করছে।
এর মধ্যেই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তুলনামূলক সংযত ভাষায় কথা বলেছেন। তিনি স্বীকার করেছেন, চলমান সংকটের জন্য কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতাই দায়ী। তিনি বলেন, ‘এর জন্য বাইরের কাউকে দায়ী করার সুযোগ নেই। আমাদেরই সমাধান খুঁজতে হবে।’
পেজেশকিয়ানের সরকার অর্থনৈতিক উদারীকরণের চেষ্টা চালালেও মুদ্রাবাজারে কিছু নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার সিদ্ধান্ত রিয়ালের দরপতন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি সরকারি হিসাবেই ৩৬ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে, যা সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। -রয়টার্স
রিপোর্টার্স২৪/এসসি