রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: বর্তমানে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার সংখ্যা কিছুটা কমলেও কিউলেক্স মশার বিস্তার দ্রুত বাড়ছে। এই প্রবণতা আগামী মার্চ মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে রাজধানীবাসীকে চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হতে পারে।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)-এর সাগর-রুনি মিলনায়তনে ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডুরা) আয়োজিত ‘মশার উপদ্রব ও নাগরিক ভোগান্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
সভায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মো. আরিফুল ইসলাম বক্তব্য দেন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন ডিআরইউ সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. সাদমান সাকিব। সভায় সভাপতিত্ব করেন ডুরার সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান মোল্লা এবং সঞ্চালনা করেন ডুরার সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম।
ড. কবিরুল বাশার বলেন, কিউলেক্স মশার উত্থান এবং এডিসের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন প্রমাণ করে ঢাকার মশা সমস্যা আর মৌসুমি নয়, এটি একটি কাঠামোগত ও বৈজ্ঞানিক সংকট। বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য উপেক্ষা করলে তার মূল্য দিতে হবে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য দিয়ে। তিনি বলেন, নাগরিক অংশগ্রহণ ছাড়া ঢাকাকে মশামুক্ত করা অসম্ভব; প্রশাসনের পাশাপাশি নাগরিক উদাসীনতাও সমানভাবে দায়ী।
তিনি আরও বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মশা সার্ভিল্যান্স তথ্য উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে সংগৃহীত প্রাপ্তবয়স্ক মশার প্রায় ৮৫ শতাংশই ছিল কিউলেক্স প্রজাতির। এটি কোনো পরিসংখ্যানগত কাকতাল নয়, বরং দীর্ঘদিনের নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রতিফলন। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বছরের পর বছর পরিষ্কার না হওয়া নালা, জলাবদ্ধ বেসমেন্ট ও পার্কিং এলাকা ঢাকাকে কিউলেক্স মশার আদর্শ প্রজননক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
ড. কবিরুল বাশার বলেন, কিউলেক্স মশা ‘রোগ ছড়ায় না’ এই ভুল ধারণার কারণে দীর্ঘদিন অবহেলিত থেকেছে। অথচ এই মশাই ফাইলেরিয়া রোগের বাহক এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে অসহনীয় করে তোলে। প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ডেঙ্গু মৌসুম এলেই কি আমরা মশা নিয়ে ভাবব, নাকি বছরের বাকি সময় কিউলেক্সের বাড়বাড়ন্তও আমাদের নজরে আসবে?
কিউলেক্স নিয়ন্ত্রণে করণীয় হিসেবে তিনি ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার, বেসমেন্ট ও পার্কিং এলাকায় পানি জমতে না দেওয়ার বাধ্যতামূলক বিধান কার্যকর, লেক ও খাল নিয়মিত পরিষ্কার এবং পরিবেশবান্ধব লার্ভা নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। পাশাপাশি বস্তি ও জলাবদ্ধ এলাকাকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়ার আহ্বান জানান।
ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন বলেন, ডেঙ্গু বা মশার উপদ্রব কমাতে সিটি করপোরেশনের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ বাসস্থান ও আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। নাগরিকদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো উদ্যোগই সফল হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পরিকল্পনাবিদ ড. মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, মশা সমস্যার সাময়িক নয়, স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। অপরিকল্পিত নগরায়ন, আবাসন, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই এই সংকটের মূল কারণ। পরিকল্পনাহীন উদ্যোগে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়।
ডিএনসিসির সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. সাদমান সাকিব জানান, ওয়ার্ডভিত্তিক ওষুধ ছিটানো ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে নিয়মিত কার্যক্রম চলছে। সামনে কিউলেক্স মশার বিস্তার বাড়তে পারে এমন আশঙ্কা বিবেচনায় রেখে এক মাসব্যাপী বিশেষ কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।
আলোচনা সভা শেষে ডুরার কার্যনির্বাহী কমিটির পক্ষ থেকে নতুন সাতজন সদস্যকে বরণ করে নেওয়া হয়। পাশাপাশি আরও তিনটি টেলিভিশন ও পত্রিকার তিনজন সেবাখাত সাংবাদিককে সদস্যপদ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি