আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে নিউইয়র্কে আনার পর ঘোষণা দিয়েছেন, আপাতত যুক্তরাষ্ট্রই দেশটিকে ‘চালাবে’। তবে মাদুরোকে তুলে নেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার দৃষ্টিকোণ থেকে নজিরবিহীন ও জটিল প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে এভাবে তুলে এনে অন্য দেশ শাসন করতে পারে না; এটি জাতিসংঘের সনদ (UN Charter) অনুযায়ী আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন, কারণ জাতিসংঘের অনুমতি (UN Security Council resolution) বা আত্মরক্ষার কারণ ছাড়া বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ, যদিও মাদুরোর বৈধতা নিয়ে বিতর্ক থাকায় কেউ কেউ ‘ভেনেজুয়েলার সরকারের সম্মতি’র যুক্তি দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তা সর্বজনগ্রাহ্য নয়। যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে 'আটক' করার দাবি করলেও, এটি ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন, যা আন্তর্জাতিক আইন সমর্থন করে না।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ:
সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন: কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে না, এবং প্রেসিডেন্টকে তুলে নেওয়া একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের উপর সরাসরি আঘাত।
জাতিসংঘ সনদের ধারা ২(৪): এই ধারা অনুযায়ী, বলপ্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকি দেওয়া নিষিদ্ধ, যদি না জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ অনুমতি দেয় বা আত্মরক্ষার প্রশ্ন থাকে।
অনুমতির প্রশ্ন: যদিও মাদুরোর নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক আছে এবং কিছু দেশ বিরোধী নেতা গুয়াইদোকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, কিন্তু মাদুরো এখনও ভেনেজুয়েলার ক্ষমতায় ছিলেন, তাই তার সম্মতি ছাড়া কোনো হস্তক্ষেপ বৈধ হয় না।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি এবং তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, কিন্তু ক্ষমতা দখলের জন্য সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনে সমর্থনযোগ্য নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পদক্ষেপ ও এর আইনি ব্যাখ্যা:
মাদুরোকে অপসারণ ও ভেনেজুয়েলা 'চালাতে' চাওয়া: এটি ভেনেজুয়েলার জনগণের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকে খর্ব করবে এবং আন্তর্জাতিক আইনে একটি 'রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন' হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
"আইনসম্মত সরকার" এর যুক্তি: যদিও কিছু দেশ বিরোধী পক্ষকে সমর্থন করে, কিন্তু ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরে তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই, তাই তাদের নামে 'সম্মতি' দেওয়াটা একটি দুর্বল আইনি যুক্তি।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, মাদুরোকে তুলে এনে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা 'চালাতে' পারে না। এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী একটি নিষিদ্ধ কাজ, যার কোনো বৈধ আন্তর্জাতিক ভিত্তি নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের আইনি ব্যাখ্যা
ট্রাম্প প্রশাসন এখনও বিস্তারিতভাবে তাদের পদক্ষেপের আইনগত ভিত্তি প্রকাশ করেনি। তবে অতীতের কিছু ঘটনা যেমন ১৯৮৯ সালের পানামা অভিযান, যেখানে বুশ প্রশাসন দেশটির নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে গ্রেপ্তার করেছিল এ বিষয়ে কিছু ধারণা দেয়। তখন যুক্তরাষ্ট্র ওই অভিযানকে ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সামরিক সহায়তা’ হিসেবে দেখেছিল। ট্রাম্প প্রশাসনও মাদুরোর অভিযানের জন্য একই যুক্তি ব্যবহার করছে।
আন্তর্জাতিক আইন ও যুক্তরাষ্ট্রের শাসনের বৈধতা
‘কারডোজো স্কুল অব ল’–এর অধ্যাপক রেবেকা ইংবারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভেনেজুয়েলা ‘চালানোর’ কোনো আইনি পথ নেই। এটি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ দখলদারত্বের সমতুল্য এবং ঘরোয়া আইনেও প্রেসিডেন্টের এমন ক্ষমতা নেই।
জাতিসংঘের সনদ ২(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো দেশ অন্য দেশের সার্বভৌম এলাকায় অনুমতি ছাড়া বা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমতি ছাড়া শক্তি প্রয়োগ করতে পারবে না। মাদুরোকে তুলে আনা এবং তার স্ত্রীকে আটক করা এই সনদের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হতে পারে।
প্রেসিডেন্টের সহজাত সুরক্ষা ক্ষমতা
ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, অভিযানটি ‘সহজাত সুরক্ষা ক্ষমতা’র আওতায় এসেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কর্মীদের সুরক্ষার জন্য প্রেসিডেন্টকে বিদেশে সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেয়। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, হেলিকপ্টারগুলো আক্রমণের মুখে পড়েছিল এবং তারা পাল্টা গুলি চালিয়েছিল, যা আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল।
মাদুরোর বৈধতা ও দায়মুক্তি
মাদুরো ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং হুগো চাভেজের মৃত্যুর পর অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০১৩ সালে নির্বাচিত হয়েছেন, তবে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন তাকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রপ্রধানদের সাধারণত বিদেশি আদালতে ছাড় দেওয়ার নীতি থাকলেও, মাদুরোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তাকে বৈধ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ‘কারডোজো স্কুল অব ল’–এর ইংবার অনুমান, তাই মাদুরো রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়মুক্তি পাবেন না।
যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও আদালতের ভূমিকা
মার্কিন আদালত সাধারণত গ্রেপ্তারি পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন না করলেও, আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে এ ধরনের অভিযান বিতর্কিত। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ঘরোয়া আইন প্রেসিডেন্টকে কিছু ক্ষেত্রে কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা দেয়, আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক হতে পারে।
পরবর্তী বিষয়
মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও অস্ত্র পাচারের অভিযোগে বিচার শুরু হওয়ার কথা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের সনদ অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ নিয়ে বিভিন্ন দেশের, বিশেষত ব্রিটেনের উদ্বেগ রয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি