স্টাফ রিপোর্টার: প্রশ্নফাঁস, ডিভাইসের মাধ্যমে জালিয়াতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছেন একদল নিয়োগপ্রত্যাশী। একই সঙ্গে পাঁচ দফা দাবি জানিয়ে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
রোববার (১১ জানুয়ারি) বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর মিরপুরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রধান ফটকের সামনে এ কর্মসূচি শুরু হয়। দুপুর ১২টা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় তারা পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস ও জালিয়াতির প্রতিবাদে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
বিক্ষোভ চলাকালে আন্দোলনকারীদের হাতে ‘প্রশ্নফাঁস চলবে না, চলবে না’, ‘প্রশ্নফাঁস হটাও, শিক্ষা বাঁচাও’, ‘মেধাবীরা বঞ্চিত কেন, ডিপিই জবাব চাই’, ‘পরিশ্রমের কোনো মর্যাদা নেই’ এ ধরনের লেখা সংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়।
আন্দোলনকারীরা যে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেছেন, সেগুলো হলো—
১. সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করে দ্রুত নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া।
২. সব সরকারি চাকরির পরীক্ষা ঢাকায় নেওয়া এবং প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রে ডিভাইস চেকার ও নেটওয়ার্ক জ্যামার স্থাপন করা।
৩. একটি স্বতন্ত্র কমিটি গঠন করে তার আওতায় সব নিয়োগ পরীক্ষা পরিচালনা করা এবং একই দিনে একই সময়ে একাধিক পরীক্ষা না নেওয়া।
৪. যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পূর্বে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ রয়েছে, তাদের কোনোভাবেই প্রশ্ন প্রণয়নের দায়িত্ব না দেওয়া।
৫. প্রশ্নফাঁসের প্রমাণ মিললে জড়িত সবাইকে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনা এবং প্রশ্ন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে বাধ্য করা।
পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ
জানা যায়, গত ৯ জানুয়ারি বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত দেশের ৬১ জেলায় (পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা ব্যতীত) একযোগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন ১০ লাখ ৮০ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী।
পরীক্ষার কয়েক দিন আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, পরীক্ষার দুই দিন আগে সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নের একটি অংশ থেকে হুবহু কয়েকটি প্রশ্ন পরীক্ষায় এসেছে। এতে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ আরও জোরালো হয়।
চাকরিপ্রার্থীদের দাবি, ২৫ ডিসেম্বর প্রশ্নপত্র জেলা পর্যায়ে পাঠানোর প্রায় দুই সপ্তাহ পর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় একটি চক্রের হাতে প্রশ্নপত্র চলে গেছে।
‘ডিভাইস পার্টি’র তৎপরতা
এ ছাড়া পরীক্ষা ঘিরে সক্রিয় হয়ে ওঠে তথাকথিত ‘ডিভাইস পার্টি’। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তারা পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে চুক্তি করে ডিভাইসের মাধ্যমে পরীক্ষায় জালিয়াতি করেছে। চুক্তিবদ্ধ পরীক্ষার্থীদের ডিভাইস সরবরাহ করে পরীক্ষা শুরুর পরপরই বাইরে থেকে উত্তর সরবরাহ করা হয়।
পরীক্ষার্থীরা জানান, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় এ চক্রটি বেশি সক্রিয় ছিল। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর সেখানে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা বাড়ে এবং ডিভাইস ব্যবহার করে পরীক্ষা দেওয়া শতাধিক পরীক্ষার্থীকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গাইবান্ধায় ৫৩ জন, নওগাঁয় ১৮ জন, দিনাজপুরে ১৮ জন, কুড়িগ্রামে ১৬ জন এবং রংপুরে দুইজনসহ শতাধিক পরীক্ষার্থী জালিয়াতির অভিযোগে আটক হন।
তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, অনেক জালিয়াত পরীক্ষার্থী পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও কক্ষ পরিদর্শকদের নজরদারি এড়িয়ে পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে গেছেন। কোথাও কোথাও কক্ষ পরিদর্শকদের একটি অংশও জালিয়াত চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশের অন্যান্য অনেক জেলায় তেমন কোনো নজরদারি না থাকায় সেখানে নির্বিঘ্নে অনিয়ম হয়েছে বলে দাবি চাকরিপ্রার্থীদের।
পরীক্ষার পরিসংখ্যান
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার দুই ধাপে মোট ১৪ হাজার ৩৮৫টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে ১০ লাখ ৮০ হাজার ৮০টি। সে হিসাবে গড়ে প্রতিটি পদের বিপরীতে প্রতিযোগিতা করেছেন প্রায় ৭৫ জন চাকরিপ্রার্থী।
প্রথম ধাপে (রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগ) ১০ হাজার ২১৯টি পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে ৭ লাখ ৪৫ হাজার ৯২৯টি। দ্বিতীয় ধাপে (ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ) ৪ হাজার ১৬৬টি পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ১৫১টি। তবে ঠিক কতজন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন এবং কতজন অনুপস্থিত ছিলেন, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত তথ্য দেয়নি অধিদপ্তর।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি