রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: বরেণ্য সংগীতশিল্পী, সুরকার, সংগীত প্রযোজক এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক মলয় কুমার গাঙ্গুলী মারা গেছেন।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাতে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
শিল্পীর মৃত্যুর বিষয়টি জানিয়েছেন, ‘ভাওয়াইয়া অঙ্গন’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ বেতারের সাবেক সংগীত প্রযোজক একেএম মোস্তাফিজুর রহমান।
জানা গেছে, প্রয়াত এই শিল্পীর মরদেহ বর্তমানে মিরপুরে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে রাখা হয়েছে। তার একমাত্র কন্যা অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন। তিনি দেশে ফিরলে শিল্পীর শেষকৃত্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মলয় কুমার গাঙ্গুলীর প্রয়াণে দেশের সংগীতাঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। একেএম মোস্তাফিজুর রহমান এক ফেসবুক পোস্টে শোক জানিয়ে লেখেন,
‘আমার প্রিয় মলয় দা নীরবে নিঃশব্দে অনন্তকালের পথে চলে গেলেন। তিনি ছিলেন দেশবরেণ্য লোকসংগীত শিল্পী, বাংলাদেশ বেতারের সুরকার ও সংগীত প্রযোজক এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বীর মুক্তিযোদ্ধা একজন প্রকৃত কণ্ঠযোদ্ধা।’
তিনি আরও স্মরণ করেন মলয় কুমার গাঙ্গুলীর গাওয়া জনপ্রিয় গান ‘আমার মন তো বসে না গৃহ কাজে সজনী গো, অন্তরে বৈরাগীর লাউয়া বাজে’ যা আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে গভীরভাবে অনুরণিত হয়।
এছাড়া তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি গণগ্রন্থাগারে নিজের জীবনের প্রথম চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে মলয় কুমার গাঙ্গুলীর বিশেষ অবদান ছিল।
জন্ম, মুক্তিযুদ্ধ ও সংগীতজীবন
১৯৪৪ সালে নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার মোজাফফরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মলয় কুমার গাঙ্গুলী। দেশপ্রেম ও সংগীত সাধনাই ছিল তার জীবনের প্রধান অনুষঙ্গ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি কণ্ঠকে অস্ত্র করে লড়াই করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় গিয়ে যোগ দেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে বসেই নিয়মিত গান লেখা, সুরারোপ ও কণ্ঠের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা ও দেশবাসীকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন তিনি।
স্বাধীনতার পর চলচ্চিত্রেও তার কণ্ঠ ও সুর ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ‘পুত্রবধূ’ চলচ্চিত্রে গাওয়া তার গান ‘গুরু উপায় বলো না’ ব্যাপক সাড়া ফেলে, যেখানে ঠোঁট মিলিয়েছিলেন প্রয়াত অভিনেতা প্রবীর মিত্র। এছাড়া ‘আমার মন তো বসে না গৃহ কাজে সজনী গো’, *‘অন্তরে বৈরাগীর লাউয়া বাজে’*সহ বহু কালজয়ী গানে তিনি অমর হয়ে আছেন শ্রোতাদের হৃদয়ে।
রাজনৈতিক সংগীতেও স্মরণীয় অবদান
মলয় কুমার গাঙ্গুলীর ক্যারিয়ারের একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক ছিল ১৯৯০ সালে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের জন্য তৈরি করা ঐতিহাসিক গান ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত, বঙ্গবন্ধু মরে নাই’–এ সুরারোপ। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের সময় ‘জনতার নৌকা’ অ্যালবামে গানটি অন্তর্ভুক্ত হলে এটি দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গানটি সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠে পুনরায় রেকর্ড করান। পরবর্তীতে ২০২০ সালে সরকার শিল্পীর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ২০ লাখ টাকা অনুদান প্রদান করে।
নিঃশব্দ বিদায়
উল্লেখ্য, জীবদ্দশায় মলয় কুমার গাঙ্গুলী বলে গিয়েছিলেন—তার মৃত্যুর পর কোনো আনুষ্ঠানিক সম্মান বা স্বীকৃতির জন্য তিনি কোনো আবেদন রাখতে চান না।
দেশের সংগীত, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য নাম হয়ে থাকা এই কণ্ঠযোদ্ধার প্রয়াণে জাতি হারাল এক নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সৈনিককে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি