রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: সন্তান জন্ম মানেই আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর পরিপূর্ণতার গল্প এটাই সমাজের প্রচলিত ধারণা। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেক সময়ই ভিন্ন। অসংখ্য নতুন মায়ের জীবনে এই সময়টি আনন্দের পাশাপাশি বয়ে আনে গভীর মানসিক চাপ, অবসাদ আর অজানা উদ্বেগ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, এই অবস্থার নাম পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বা প্রসবোত্তর অবসাদ যা এখন ক্রমেই বাড়তে থাকা একটি নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি।
দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা শ্রবণা গুপ্ত জানান, মেয়ের জন্মের পর হঠাৎ করেই বদলে যেতে শুরু করে তার জীবন। “মনটা সারাক্ষণ ভারী লাগত। অকারণে কান্না পেত, কিছুই ভালো লাগত না। বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করত না। নিজেকেই চিনতে পারছিলাম না,”—বলছিলেন তিনি।
অনেকদিন পর চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে জানতে পারেন, তিনি পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে ভুগছেন।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান কলকাতার আরেক মা, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর থেকেই তিনি অল্পতেই রেগে যেতেন, শিশুর কান্না অসহ্য লাগত। “কখনো বালিশ কানে চেপে বসে থাকতাম। পরিবার ভেবেছিল আমি হয়তো দায়িত্ব নিতে চাইছি না। কিন্তু ভিতরে কী যে চলছিল, কাউকে বোঝাতে পারিনি।”
পরবর্তীতে চিকিৎসা নিয়ে জানতে পারেন, তিনিও প্রসবোত্তর অবসাদের শিকার।
নতুন নয়, তবু অবহেলিত বাস্তবতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো নতুন সমস্যা নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে গর্ভাবস্থায় প্রায় ১০ শতাংশ এবং সন্তান জন্মের পর প্রায় ১৩ শতাংশ নারী অবসাদে ভোগেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই হার আরও বেশি।
তবে সামাজিক লজ্জা, অজ্ঞতা ও সচেতনতার অভাবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমস্যাটি ধরা পড়ে না।
চিকিৎসকদের মতে, সময়মতো চিকিৎসা না হলে মায়ের আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ে, পাশাপাশি শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন কী
স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ডা. কৃষ্ণা ঘোষ জানান, গর্ভাবস্থা থেকে সন্তান জন্মের পর পর্যন্ত একজন নারী হরমোনজনিত ও মানসিকভাবে বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যান। সন্তান জন্মের পর প্রথম ছয় সপ্তাহের মধ্যে যে গভীর অবসাদ দেখা দেয়, সেটিই পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন। নিউরোসাইকিয়াট্রিস্ট ডা. রাজর্ষি নিয়োগী বলেন, এই সমস্যাকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা হয়
পোস্টপার্টাম ব্লুজ: মন খারাপ, কান্না, খিটখিটে ভাব সাধারণত অল্প সময়েই সেরে যায়।
পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন: দীর্ঘস্থায়ী অবসাদ, আত্মবিশ্বাস হারানো, নিজেকে অযোগ্য মনে করা।
পোস্টপার্টাম সাইকোসিস: সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ, যেখানে মা বাস্তববোধ হারাতে পারেন এবং নিজের বা সন্তানের ক্ষতির চিন্তা আসতে পারে।
কেন বাড়ছে এই সমস্যা
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমোনের হঠাৎ পরিবর্তন, জটিল প্রসব, সিজারিয়ান ডেলিভারি, আগের মানসিক সমস্যার ইতিহাস সবই ঝুঁকি বাড়ায়। এ ছাড়া সামাজিক চাপ, বিশেষ করে কন্যাসন্তান জন্মের পর অবহেলা, স্বামী ও পরিবারের অসহযোগিতা, পর্যাপ্ত ঘুম ও খাবারের অভাব এই অবসাদকে আরও গভীর করে তোলে।
প্যারেন্টিং কনসাল্ট্যান্ট পায়েল ঘোষ বলেন, একজন মা যখন একা সব দায়িত্ব সামলাতে বাধ্য হন, তখন মানসিক ভাঙন আসাটা অস্বাভাবিক নয়।
সবচেয়ে বড় বাধা লজ্জা ও ভয়
সমস্যা থাকলেও অনেক মা মুখ খুলতে সাহস পান না। সমাজে এখনো ধারণা, মা মানেই সব সহ্য করার শক্তি। ফলে চিকিৎসা নিতে দেরি হয়, বিপদ বাড়ে।
সমাধানের পথ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে জরুরি হলো সমস্যাটিকে স্বীকৃতি দেওয়া। পরিবারের সহানুভূতি, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, নিয়মিত চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং এই অবসাদ থেকে বেরিয়ে আসার প্রধান চাবিকাঠি। বর্তমানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য টেলি-ম্যানাসসহ বিভিন্ন হেল্পলাইন চালু রয়েছে, যা নতুন মায়েদের জন্য বড় সহায়তা হতে পারে।
ডা. কৃষ্ণা ঘোষের কথায়, সন্তান যেমন যত্ন চায়, সদ্য মা হওয়া একজন নারীরও ঠিক ততটাই যত্ন, বোঝাপড়া ও ভালোবাসা প্রয়োজন। এটা বুঝতে পারলেই বহু জীবন রক্ষা পাবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম