রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: শ্বাসযোগ্য বাতাসের জন্য হাহাকার চলছে রাজধানী ঢাকায়। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) সকালেও বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে এই মহানগর। সকাল সোয়া আটটার দিকে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউ এয়ারের তথ্যমতে, ঢাকার বায়ুর মান সূচক (AQI) ছিল ২৭৪ যা ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ের মধ্যে পড়ে। একই মান নিয়ে তালিকার শীর্ষে ছিল মিসরের রাজধানী কায়রোও। তবে ঢাকার কয়েকটি এলাকায় দূষণের মাত্রা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে চারটি স্থানে বায়ুর মান ৩০০ ছাড়িয়ে গেছে, যা সর্বোচ্চ ‘দুর্যোগপূর্ণ’ স্তর হিসেবে বিবেচিত।
টানা চার দিন ধরে বায়ুদূষণে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে ঢাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দীর্ঘস্থায়ী দূষণের কারণে নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা, চোখ জ্বালা, হাঁপানি ও ফুসফুসজনিত সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের বদলে সরকারের পক্ষ থেকে কেবল গৎবাঁধা বক্তব্য আর লোকদেখানো কর্মসূচিই চোখে পড়ছে।
গত প্রায় তিন সপ্তাহ ধরেই বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকার শীর্ষ সারিতে অবস্থান করছে ঢাকা। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আইকিউ এয়ার নিয়মিতভাবে বিশ্বের বিভিন্ন শহরের বাতাসের মান পর্যবেক্ষণ করে থাকে। তাদের লাইভ সূচকের মাধ্যমে একটি শহরের বাতাস মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, সে বিষয়ে সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়। আজ ঢাকার বায়ুদূষণের মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি নগরবাসীর জন্য বেশ কিছু সুরক্ষামূলক পরামর্শ দিয়েছে।
পরিবেশ পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ঢাকার বায়ুদূষণ কমার কোনো লক্ষণ নেই বরং দিন দিন পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। গত ডিসেম্বর মাসজুড়ে এবং জানুয়ারির প্রায় প্রতিটি দিনই ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর নগরীগুলোর তালিকায় ছিল। এ ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুর মান সূচক ২০০ ছাড়ালে সেটিকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ ধরা হয়। আর এই মান ৩০০ অতিক্রম করলে তা ‘দুর্যোগপূর্ণ’ অবস্থায় পৌঁছে যায়। শুধু ঢাকা নয়, দেশের অন্যান্য এলাকাতেও বায়ুদূষণ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। কোনো কোনো সময় ঢাকার বাইরের কয়েকটি অঞ্চলে দূষণের মাত্রা রাজধানীর চেয়েও বেশি দেখা যাচ্ছে। যদিও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া বেশিরভাগ উদ্যোগ ঢাকাকেন্দ্রিক, তবু সেগুলোর বাস্তব কোনো সুফল এখনো দৃশ্যমান নয়।
স্থানীয় দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা
বায়ুদূষণের প্রসঙ্গ এলেই পরিবেশ অধিদপ্তর বা সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল উপমহাদেশীয় বায়ুপ্রবাহকে প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরে। তাদের দাবি, ভারতের দিল্লি বা পাকিস্তানের লাহোর ও করাচি অঞ্চল থেকে আসা দূষিত বাতাসের প্রভাবেই বাংলাদেশে দূষণের মাত্রা বাড়ছে। তবে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়নকেন্দ্র (ক্যাপস)-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার এই ব্যাখ্যাকে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য মনে করেন না।
তিনি বলেন, উপমহাদেশীয় বায়ুপ্রবাহের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না ঠিকই, কিন্তু এটিকে একমাত্র বা প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো মূল সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরানোর শামিল। যদি বাইরের বাতাসই দায়ী হতো, তাহলে উৎস অঞ্চলগুলো সব সময় তালিকার শীর্ষে থাকত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বহু সময় ঢাকার চেয়ে সেই অঞ্চলগুলোর দূষণ কম থাকে। আজ যেমন ঢাকার পর ভারতের রাজধানী দিল্লির বায়ুর মান ১৮১—যা ঢাকার চেয়ে প্রায় একশ পয়েন্ট কম।
অধ্যাপক মজুমদার আরও বলেন, ঢাকার বায়ুদূষণের স্থানীয় উৎসগুলো কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না। যানবাহন ও শিল্পকারখানার কালো ধোঁয়া, নির্মাণকাজ থেকে উড়তে থাকা ধুলাবালি, বিভিন্ন বর্জ্য পোড়ানো এবং ইটভাটার দূষণ—এসবই ঢাকার বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলছে। এসব উৎস নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান কোনো কঠোর উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি।
বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
দীর্ঘদিন ধরে খুব অস্বাস্থ্যকর বায়ুতে বসবাস করলে মানুষের শরীরে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ, ক্লান্তি—এমন উপসর্গ ক্রমেই বাড়ছে। অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার জানান, সাম্প্রতিক সময়ে অনেক মানুষ তাঁর কাছে অস্বাভাবিক মাথাব্যথা ও শ্বাসজনিত সমস্যার কথা বলছেন। অনেকেই বুঝতে পারছেন, দূষিত বাতাসই এসব সমস্যার বড় কারণ। পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল আকার নিচ্ছে।
ঢাকার যেসব এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ
বুধবার সকালে ঢাকার অন্তত আটটি এলাকায় বায়ুর মান ছিল অত্যন্ত খারাপ। এলাকাগুলো হলো—নিকুঞ্জের এএসএল সিস্টেমস লিমিটেড (৪৫৯), ধানমন্ডি (৩৬৪), দক্ষিণ পল্লবী (৩৩৪), মিরপুরের ইস্টার্ন হাউজিং (৩০৪), বে’জ এইজ ওয়াটার (২৮৬), বেচারাম দেউড়ী (২৭৪), গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এলাকা (২৫২) এবং গোড়ান (২২৬)।
দেশে বায়ুদূষণ মোকাবিলায় বিভিন্ন সময়ে নানা প্রকল্প ও পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। বরং ঢাকার বাতাস দিন দিন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
নাগরিকদের জন্য সতর্কতা
আইকিউ এয়ারের পরামর্শ অনুযায়ী, আজকের এই বায়ুদূষণের পরিস্থিতিতে বাইরে বের হলে অবশ্যই মানসম্মত মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। খোলা জায়গায় ব্যায়াম বা দীর্ঘ সময় অবস্থান না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঘরের জানালা যতটা সম্ভব বন্ধ রাখারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম