| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

ইরানকে চাপে রাখতে যুদ্ধের বিকল্প ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র ?

reporter
  • আপডেট টাইম: জানুয়ারী ২৯, ২০২৬ ইং | ১১:৩৬:৫৮:পূর্বাহ্ন  |  ৬৭৯২৭০ বার পঠিত
ইরানকে চাপে রাখতে যুদ্ধের বিকল্প ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র ?
ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত ছবি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে এমন কিছু সামরিক পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করছেন, যার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনী ও শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে সীমিত হামলার বিকল্পও রয়েছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এর লক্ষ্য হতে পারে সাম্প্রতিক দমন–পীড়নের পর আবারও ইরানে বিক্ষোভ উসকে দেওয়া। তবে ইসরায়েল ও আরব কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু আকাশপথে হামলা চালিয়ে তেহরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা উৎখাত করা সম্ভব নয়।

আলোচনার সঙ্গে যুক্ত দুই মার্কিন সূত্র জানিয়েছেন, চলতি মাসের শুরুতে দেশব্যাপী বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করার পর যাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে—ট্রাম্প এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চান, যা ‘শাসন পরিবর্তন’-এর দিকে নিয়ে যেতে পারে।

এ উদ্দেশ্যে ওয়াশিংটনের কাছে সহিংসতার জন্য দায়ী বলে বিবেচিত কমান্ডার ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলার বিকল্প খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যাতে বিক্ষোভকারীরা সরকারি ও নিরাপত্তা স্থাপনায় আক্রমণ চালাতে সাহস পায়, বলে সূত্রগুলো জানায়।

এক মার্কিন সূত্র বলেন, ট্রাম্পের সহকারীরা এমন একটি বড় ধরনের হামলার কথাও বিবেচনা করছেন, যার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে; যার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিতে আঘাত হানার বিষয়ও রয়েছে।

অন্য একটি সূত্র জানায়, সামরিক পথে যাওয়াসহ কোন বিকল্প নেওয়া হবে এ বিষয়ে ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।

এই সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও সহায়ক যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের ফলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা আরও বেড়েছে। এর আগে ট্রাম্প ইরানের দমন–পীড়নের প্রতিক্রিয়ায় একাধিকবার হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছিলেন।

তবে চারজন আরব কর্মকর্তা, তিনজন পশ্চিমা কূটনীতিক এবং আলোচনার বিষয়ে অবহিত এক জ্যেষ্ঠ পশ্চিমা সূত্র বলেছেন, তারা আশঙ্কা করছেন এ ধরনের হামলা মানুষকে রাস্তায় নামানোর বদলে বরং এমন একটি আন্দোলনকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দমন–পীড়নের ধাক্কায় ইতমধ্যে বিপর্যস্ত।

মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, বড় পরিসরে সামরিক বাহিনীর ভেতরে বিদ্রোহ না হলে ইরানের বিক্ষোভ বীরত্বপূর্ণ হলেও অস্ত্রশক্তির দিক থেকে অনেক পিছিয়ে।

এই প্রতিবেদনের সূত্রগুলো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে কথা বলায় পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বক্তব্য দিয়েছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর ও হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

এদিকে, ইরান–সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা ইরাকের এক সাবেক প্রধানমন্ত্রী আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় উঠে এসেছেন।

আলোচনার আহ্বান, তবে সংঘাতের প্রস্তুতিও

বুধবার ট্রাম্প ইরানকে আলোচনার টেবিলে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, পরমাণু অস্ত্র ইস্যুতে সমঝোতা না হলে ভবিষ্যতে যেকোনো মার্কিন হামলা জুনে তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় চালানো বোমা হামলার চেয়েও ভয়াবহ হবে। তিনি ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন জাহাজগুলোকে ইরানের দিকে অগ্রসরমান একটি “আর্মাডা” বলে বর্ণনা করেন।

রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেন, ইরান একদিকে সামরিক সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক পথও খোলা রাখছে। তবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কূটনীতিতে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ইরানের দাবি, তাদের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি বেসামরিক। দেশটি পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে সংলাপে প্রস্তুত, তবে চাপ প্রয়োগ করা হলে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠোরভাবে আত্মরক্ষা করবে; বুধবার জাতিসংঘে ইরানের মিশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এ কথা জানায়।

ট্রাম্প প্রকাশ্যে কোনো চুক্তিতে ঠিক কী চান, তা স্পষ্ট করেননি। তবে তার প্রশাসনের আগের আলোচ্য দাবির মধ্যে ছিল ইরানকে স্বতন্ত্রভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে নিষেধাজ্ঞা, দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের সশস্ত্র মিত্র নেটওয়ার্কে সীমাবদ্ধতা আরোপ।

আকাশশক্তির সীমাবদ্ধতা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ পরিকল্পনা সম্পর্কে সরাসরি অবগত এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, কেবল আকাশপথে হামলা চালিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করা সম্ভব এমন বিশ্বাস তাদের নেই।

তিনি বলেন, আপনি যদি শাসনব্যবস্থা উৎখাত করতে চান, তাহলে স্থলবাহিনী নামাতে হবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র যদি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকেও হত্যা করে, তবুও তার জায়গায় নতুন একজন নেতা আসবে।

তার মতে, বাইরের চাপের সঙ্গে একটি সংগঠিত অভ্যন্তরীণ বিরোধী শক্তির সমন্বয় ছাড়া ইরানের রাজনৈতিক গতিপথ বদলানো কঠিন।

ইসরায়েলি ওই কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিক অস্থিরতায় ইরানের নেতৃত্ব দুর্বল হলেও গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মাঝেও তারা এখনো দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।

একাধিক মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের উপসংহারও একই বিক্ষোভের কারণগুলো এখনো বিদ্যমান থাকায় সরকার দুর্বল হয়েছে, তবে বড় ধরনের ভাঙন দেখা যায়নি বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তি জানান।

এক পশ্চিমা সূত্রের মতে, ট্রাম্পের লক্ষ্য সম্ভবত ‘শাসনব্যবস্থা ভেঙে ফেলা’ নয়, বরং নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা যা ভেনেজুয়েলার মতো পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনীয়, যেখানে মার্কিন হস্তক্ষেপে প্রেসিডেন্ট বদলালেও পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা পাল্টায়নি।

খামেনি প্রকাশ্যে বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছেন এবং এই অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তার ভাষায় “বিদ্রোহীদের” দায়ী করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ বিক্ষোভ–সংক্রান্ত নিহতের সংখ্যা ৫ হাজার ৯৩৭ বলে জানিয়েছে, যার মধ্যে ২১৪ জন নিরাপত্তা সদস্য। সরকারি হিসাব অনুযায়ী নিহত ৩ হাজার ১১৭ জন। রয়টার্স স্বাধীনভাবে এই সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি।

কম দৃশ্যমান হলেও ক্ষমতায় খামেনি

৮৬ বছর বয়সী খামেনি দৈনন্দিন শাসনকার্য থেকে অনেকটাই সরে দাঁড়িয়েছেন, জনসমক্ষে উপস্থিতিও কমিয়েছেন এবং গত বছর ইসরায়েলি হামলায় ইরানের বহু শীর্ষ সামরিক নেতার নিহত হওয়ার পর নিরাপদ স্থানে অবস্থান করছেন বলে আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানান।

দৈনন্দিন প্রশাসনিক দায়িত্ব এখন ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)–ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের হাতে চলে গেছে, যার মধ্যে জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আলী লারিজানিও রয়েছেন। নিরাপত্তা কাঠামো ও অর্থনীতির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে আইআরজিসি।

তবে যুদ্ধ, উত্তরাধিকার ও পরমাণু কৌশল বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা এখনো খামেনির হাতেই ফলে তার প্রস্থান ছাড়া বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন কঠিন বলে তারা মনে করেন।

পশ্চিমা কূটনীতিকদের মতে, ওয়াশিংটন ও জেরুজালেমে কেউ কেউ মনে করেন, ইরানে ক্ষমতার রূপান্তর ঘটলে পরমাণু অচলাবস্থা ভাঙতে পারে এবং ভবিষ্যতে পশ্চিমের সঙ্গে সহযোগিতার পথ খুলতে পারে।

তবে তারা সতর্ক করে বলেন, খামেনির স্পষ্ট কোনো উত্তরসূরি নেই। এই শূন্যতায় আইআরজিসি ক্ষমতা দখল করতে পারে, যা কঠোর শাসন আরও গভীর করবে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াবে।

এ কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তুরস্ক পর্যন্ত বহু দেশ ‘ধস’ নয়, বরং ‘নিয়ন্ত্রণ’ নীতিকেই প্রাধান্য দিতে চায়। তাদের আশঙ্কা, ৯ কোটি মানুষের দেশ ইরানে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়লে তা সীমান্ত ছাড়িয়ে ভয়াবহ অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে।

২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পর যেমন গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল, তেমন পরিস্থিতি ইরানেও সৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন পশ্চিমা কূটনীতিকরা যার ফলে শরণার্থী ঢল, জঙ্গিবাদ এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ভাতানকার ভাষায়, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো,ইরান ‘প্রাথমিক পর্যায়ের সিরিয়া’র মতো খণ্ডিত হয়ে পড়া, যেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাতে জড়াবে।

আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও আশঙ্কা

দীর্ঘদিনের মার্কিন মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলো আশঙ্কা করছে, ইরান প্রতিশোধ নিলে তার প্রথম আঘাত তাদের ওপরই আসতে পারে—যার মধ্যে ইয়েমেনের হুথিদের মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলাও থাকতে পারে।

সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও মিসর ওয়াশিংটনের কাছে ইরানে হামলার বিরুদ্ধে তদবির করেছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে জানিয়েছেন, রিয়াদ তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে নিজের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না।

এক আরব সূত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ট্রিগার টানবে, কিন্তু এর পরিণতি তাদের ভোগ করতে হবে না আমাদেরই করতে হবে।

কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের মোহান্নাদ হাজ্জ–আলি বলেন, মার্কিন সেনা মোতায়েন ইঙ্গিত দিচ্ছে পরিকল্পনা একক হামলা থেকে দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের দিকে যাচ্ছে। কারণ ওয়াশিংটন ও জেরুজালেমের বিশ্বাস, ইরান আবারও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে অস্ত্রে রূপ দিতে পারে।

ভাতানকার মতে, সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি হবে একটি ধীর ক্ষয় এলিট পর্যায়ে ভাঙন, অর্থনৈতিক অচলাবস্থা ও বিতর্কিত উত্তরাধিকার যা শেষ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে পারে।রয়টার্স

রিপোর্টার্স২৪/এসসি


ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪