আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শেষ অবশিষ্ট পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি নিউ স্টার্ট (New START)–এর মেয়াদ শেষ হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেছে রাশিয়া। তবে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অস্ত্রের মোতায়েনসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা উঠে গেলেও রাশিয়া দায়িত্বশীল আচরণ বজায় রাখবে বলে জানিয়েছে দেশটি।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়, নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে আর কোনো কার্যকর চুক্তি রইল না। শীতল যুদ্ধকাল থেকে শুরু করে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যেসব পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি কার্যকর ছিল, নিউ স্টার্ট ছিল তার সর্বশেষটি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির অবসান বিশ্বের দুটি বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তিধর দেশের পারস্পরিক উদ্দেশ্য ও কৌশল বোঝাকে আরও জটিল করে তুলবে। এর ফলে ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি বাড়বে এবং নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে চীন বর্তমানে পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানোর পথে থাকায় উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।
এর আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া যেন অন্তত আরও এক বছর নিউ স্টার্ট চুক্তির মূল বিধানগুলো মেনে চলে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক জবাব না দিয়ে বলেন, তিনি চীনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে আরও ‘ভালো’ একটি চুক্তি চান।
চীন অবশ্য মস্কো ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কারণ, চীনের পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম; আনুমানিক ৬০০টি, যেখানে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটির রয়েছে প্রায় ৪ হাজার করে ওয়ারহেড।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেস্কভ বলেন, এরপর কী হবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির ওপর। তবে যেকোনো অবস্থায় রুশ ফেডারেশন পারমাণবিক অস্ত্রসংক্রান্ত কৌশলগত স্থিতিশীলতার প্রশ্নে দায়িত্বশীল ও সতর্ক অবস্থান বজায় রাখবে এবং সর্বাগ্রে জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেবে।
এদিকে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই এবং তিনি উপযুক্ত সময়ে এ বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করবেন।
মেয়াদ শেষ হওয়া নিয়ে বিভ্রান্তি
চুক্তির সুনির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর কিংবা রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেউই নির্দিষ্ট সময় জানায়নি। তবে পেস্কভ জানান, বৃহস্পতিবার দিনের শেষেই নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে।
রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ, যিনি ২০১০ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন, তিনি বুধবার বলেন নিউ স্টার্ট ও এর আগের সব পারমাণবিক চুক্তি এখন “অতীতের বিষয়।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, মস্কোর ধারণা অনুযায়ী চুক্তিটি আর কার্যকর নেই এবং উভয় দেশই এখন নিজেদের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে স্বাধীন।
কঠোর প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত, তবে কূটনীতির দরজা খোলা
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে ‘ভুল ও দুঃখজনক’ আখ্যা দিয়ে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নতুন হুমকি মোকাবিলায় প্রয়োজন হলে ‘নির্ধারক সামরিক-প্রযুক্তিগত পাল্টা ব্যবস্থা’ নেওয়া হতে পারে। তবে একই সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখার কথাও জানানো হয়।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেছে চীনও। দেশটি কৌশলগত স্থিতিশীলতা নিয়ে সংলাপ পুনরায় শুরুর আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে ইউক্রেন দাবি করেছে, নিউ স্টার্টের মেয়াদ শেষ হওয়া বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামো ভাঙনের ক্ষেত্রে রাশিয়ার ভূমিকারই ফল। ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট পুতিন এটিকে ‘পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইলের আরেকটি হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করছেন, যাতে ইউক্রেনের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন দুর্বল করা যায়।
পারমাণবিক ঝুঁকি সর্বোচ্চ পর্যায়ে: জাতিসংঘ
বিশ্লেষকদের মতে, নিউ স্টার্টের মতো কোনো চুক্তি না থাকায় কৌশলগত স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমেয়তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর ফলে উভয় পক্ষই সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির আশঙ্কায় নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার আরও বাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই নিউ স্টার্টে নির্ধারিত ১,৫৫০ ওয়ারহেডের সীমা ছাড়িয়ে শত শত অতিরিক্ত ওয়ারহেড মোতায়েন করা সম্ভব হবে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক কারিম হাগাগ বলেন, “স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমেয়তা অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অদৃশ্য সুবিধাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এগুলো ছাড়া পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর সম্পর্ক আরও সংকটপ্রবণ হয়ে উঠবে বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কয়েক দশকের অর্জন ভেঙে পড়া এর চেয়ে খারাপ সময়ে হতে পারত না। কয়েক দশকের মধ্যে এখন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
তিনি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে বিলম্ব না করে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যাচাইযোগ্য সীমা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও ঝুঁকি কমাতে একটি নতুন চুক্তি কাঠামো জরুরি।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি