আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার আলোচনার পর যুদ্ধবন্দি বিনিময়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। চুক্তি অনুযায়ী, উভয় পক্ষ মোট ৩১৪ জন যুদ্ধবন্দি বিনিময়ে সম্মত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি নিশ্চিত করেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। তিনি জানান, জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে যৌথভাবে মার্কিন মধ্যস্থতা দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তিনি। উইটকফ বলেন, এখনও গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ বাকি। তবে এ ধরনের পদক্ষেপ প্রমাণ করে, ধারাবাহিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বাস্তব ফল দিচ্ছে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে অগ্রগতি ঘটাচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ইউক্রেনের প্রতিনিধিদলে ছিলেন দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা পরিষদের সচিব রুস্তেম উমেরভসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
আলোচনার আগে রাশিয়ার প্রধান আলোচক কিরিল দিমিত্রিয়েভ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, বিষয়গুলো ইতিবাচক ও ভালো দিকেই এগোচ্ছে। তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক পুনর্গঠনে সক্রিয় কাজ চলছে, যার মধ্যে অর্থনৈতিক বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র–রাশিয়া যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপও রয়েছে।
তবে ইউরোপীয় দেশগুলোর সমালোচনা করে দিমিত্রিয়েভ অভিযোগ করেন, তারা এই প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি ও হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছে।
এর আগে জানুয়ারির শেষ দিকে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ত্রিপক্ষীয় আলোচনা ভূমি প্রশ্নে তেমন অগ্রগতি আনতে পারেনি। মস্কো এখনো দাবি করছে, ইউক্রেনকে ডোনেৎস্ক অঞ্চলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা ছেড়ে দিতে হবে, যা প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সরকার স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
যুদ্ধবন্দি বিনিময়
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা রিয়া নভোস্তি পরে জানায়, উভয় দেশ ১৫৭ জন করে যুদ্ধবন্দি বিনিময় করেছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, কুরস্ক অঞ্চল থেকে তিনজন বেসামরিক নাগরিককেও রাশিয়ায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
গত কয়েক মাসের মধ্যে এটি ছিল রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে প্রথম সফল যুদ্ধবন্দি বিনিময়। এর আগে সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর বন্দি বিনিময় হয়েছিল, যা তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত তিন দফা সরাসরি আলোচনার পর হওয়া ‘ইস্তাম্বুল চুক্তি’র আওতায় সম্পন্ন হয়।
এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হলো যুদ্ধ শুরুর প্রায় চার বছর পূর্তির (২৪ ফেব্রুয়ারি) ঠিক আগমুহূর্তে। চলতি সপ্তাহে বিরল এক স্বীকারোক্তিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানান, ২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে প্রায় ৫৫ হাজার ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, আরও হাজারো সেনা নিখোঁজ রয়েছেন এবং এই বিপুল মানবিক ক্ষতিই উভয় পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করেছে।
চলছেই হামলা
যুদ্ধবন্দি বিনিময়ের চূড়ান্ত প্রস্তুতির মধ্যেও হামলা থেমে থাকেনি। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাতভর রুশ ড্রোন হামলায় দুই বৃদ্ধা নারী আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আবাসিক ভবন, একটি অফিস ভবন ও একটি কিন্ডারগার্টেন জানিয়েছেন কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিৎসকো।
ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানায়, রাতে রাশিয়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৮৩টি ড্রোন নিক্ষেপ করে। এর মধ্যে ১৫৬টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। কিয়েভ সংলগ্ন অঞ্চলেও একজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় গভর্নর।
এই হামলাগুলো শীতের সবচেয়ে কঠিন সময়ে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো রাশিয়ার বৃহত্তর অভিযানের অংশ।
এর এক দিন আগে, বুধবার ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর দ্রুঝকিভকার একটি ব্যস্ত বাজারে গোলাবর্ষণ করে রুশ বাহিনী। ডোনেৎস্ক অঞ্চলের গভর্নর ভাদিম ফিলাশকিন জানান, ক্লাস্টার মিউনিশন ব্যবহার করে চালানো ওই হামলায় অন্তত সাতজন নিহত এবং ১৫ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তির বয়স ছিল ৮১ বছর।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি