যশোর প্রতিনিধি: বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট (আইসিপি) দিয়ে দেশে আনা হয়েছে টাঙ্গাইল-৮ (সখীপুর-বাসাইল) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলামের মরদেহ। রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁ থানার হরিদাসপুর ইমিগ্রেশন পুলিশ ও বেনাপোল ইমিগ্রেশন পুলিশের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
গত শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে কলকাতার দমদম এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন ৭০ বছর বয়সী এই রাজনীতিক। পরিবারের সদস্যরা জানান, মৃত্যুর আগে এক সপ্তাহের বেশি সময় তিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এবং শেষ তিন দিন লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাল্টি অর্গান ফেইলিওর ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।
মৃত্যুকালে তার স্ত্রী ও এক মেয়ে পাশে ছিলেন। অসুস্থতার খবর পেয়ে তারা মেডিকেল ভিসায় কলকাতায় যান। পারিবারিক সূত্র জানায়, দেশের মাটিতে দাফনের ইচ্ছা অনুযায়ী মরদেহ বাংলাদেশে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পর কলকাতাস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) সংগ্রহ করা হয়। মরদেহ সংরক্ষণের জন্য কলকাতার ‘পিস হেভেন’-এ রাখা হয়েছিল।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পটপরিবর্তনের পর তিনি আড়ালে চলে যান বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা ছিল। এলাকায় গুঞ্জন ছিল, তিনি ভারতে অবস্থান করছেন এবং পরবর্তীতে কলকাতার নিউটাউনে বসবাস শুরু করেন। বাংলাদেশ ও কলকাতায় তাকে প্রকাশ্যে খুব কমই দেখা গেছে বলে স্থানীয়দের বক্তব্য। তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট একাধিক মামলা ছিল বলে জানা যায়।
২০২৫ সালের ৮ মার্চ এক তরুণী নিজেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক পরিচয় দিয়ে তার পরিবারের কাছে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে বলে অভিযোগ ওঠে। চাঁদা না পেয়ে বাড়ি দখল, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে এবং সেখানে ‘পাগলের আশ্রম’ চালুর দাবি করা হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। পরে যৌথবাহিনীর অভিযানে বাড়িটি দখলমুক্ত করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট তরুণীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জোয়াহেরুল ইসলাম টাঙ্গাইল জেলার সখীপুর উপজেলার বেড়বাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা পরান আলী মিয়া ও মাতা মালেকা বেগম। শিক্ষাজীবনে তিনি স্নাতকোত্তর ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পেশায় টাঙ্গাইল আদালতের আইনজীবী ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি।
১৯৭৯ সালে সরকারি সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে টাঙ্গাইল জেলা ছাত্রলীগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক ছিলেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের টাঙ্গাইল জেলা কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখেন। ১৯৮৭-৮৮ ও ১৯৮৯-৯০ মেয়াদে সরকারি সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) ছিলেন। ‘ভিপি জোয়াহের’ নামেই তিনি অধিক পরিচিতি পান।
পরবর্তীতে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০১৭ সালে পুনরায় এ পদে নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে অংশগ্রহণ করে টাঙ্গাইল-৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক জীবনে দলীয় সংগঠন শক্তিশালীকরণ ও এলাকায় শিক্ষা-সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে তার অনুসারীরা জানিয়েছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিজ জন্মভূমি সখীপুরেই তাকে দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। জানাজা ও দাফনের সময়সূচি পরে জানানো হবে। তার মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন, রাজনৈতিক সহকর্মী ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
বেনাপোল ইমিগ্রেশন পুলিশের অফিসার ইনচার্জ সাখাওয়াত হোসেন জানান, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সাবেক সংসদ সদস্যের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি