| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

মারণাস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? পেন্টাগন-অ্যানথ্রোপিক লড়াইয়ের নেপথ্য কথা

reporter
  • আপডেট টাইম: মার্চ ২৯, ২০২৬ ইং | ১৭:৪০:৪৮:অপরাহ্ন  |  ২০০৪৮ বার পঠিত
মারণাস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? পেন্টাগন-অ্যানথ্রোপিক লড়াইয়ের নেপথ্য কথা
ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত

আশিস গুপ্ত 

সিলিকন ভ্যালির রোদঝলমলে ল্যাবরেটরি থেকে শুরু করে ইরান বা ইউক্রেনের ধূলিধূসরিত রণক্ষেত্র—২০২৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর কেবল ভবিষ্যতের কল্পনা নয়, বরং এক অমোঘ বাস্তব। যে প্রযুক্তি একসময় মানুষের জীবন সহজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, আজ তা যুদ্ধের ময়দানে কার কার জীবন কেড়ে নেবে, সেই সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছে। ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক বন্দি করা থেকে শুরু করে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান—সবখানেই এআই তার অদৃশ্য থাবা বিস্তার করেছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির চরম আস্ফালনের মধ্যেই জন্ম নিয়েছে এক অভূতপূর্ব সংঘাত, যা খোদ আমেরিকার প্রযুক্তি উপত্যকা বা সিলিকন ভ্যালির চিরাচরিত প্রগতিশীল ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছে। পেন্টাগন এবং বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠান 'অ্যানথ্রোপিক'-এর মধ্যকার এই লড়াই এখন কেবল একটি ব্যবসায়িক চুক্তি ভঙ্গের গল্প নয়, বরং এটি মানবতার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

অ্যানথ্রোপিকের তৈরি 'ক্লদ' (Claude) মডেলটি যখন পেন্টাগন গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও অভিযানের মানচিত্র তৈরিতে ব্যবহার করছিল, তখনই সামনে আসে দুটি আপসহীন শর্ত। অ্যানথ্রোপিক সাফ জানিয়ে দেয়—তাদের প্রযুক্তি মার্কিন নাগরিকদের ওপর নজরদারি বা মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া 'স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র' (Killer Robots) তৈরিতে ব্যবহার করা যাবে না। পেন্টাগন এই শর্তে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তাদের দাবি, কোনো বেসরকারি সংস্থা সামরিক বাহিনীর অস্ত্র ব্যবহারের নীতি নির্ধারণ করতে পারে না। এই অচলাবস্থা যখন আইনি বিবাদ ও সাংস্কৃতিক যুদ্ধের রূপ নেয়, তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। তিনি সমস্ত ফেডারেল সংস্থাকে অ্যানথ্রোপিক ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ দিয়ে কোম্পানিটিকে 'জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সাপ্লাই-চেইন ঝুঁকি' হিসেবে চিহ্নিত করেন। এর ফলে ঐতিহাসিকভাবে উদারপন্থী সিলিকন ভ্যালিতে এক গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে এআই যুদ্ধক্ষেত্রে এমনভাবে সংহত হয়েছে যে, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো (LLM) এখন রণকৌশল নির্ধারণের প্রধান হাতিয়ার। অ্যানথ্রোপিকের মূল শঙ্কা ছিল, সরকার এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ওয়েব ব্রাউজিং বা টেলিফোন মেটাডেটা বিশ্লেষণ করে এক সর্বব্যাপী 'ডিজিটাল প্যানোপটিকন' বা নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। অন্যদিকে, যুদ্ধের ময়দানে 'স্পিড অফ ফাইট' বা দ্রুততম সিদ্ধান্তের প্রয়োজনের দোহাই দিয়ে পেন্টাগন মানুষের নিয়ন্ত্রণ বা 'হিউম্যান-ইন-দ্য-লুপ' প্রক্রিয়াকে সংকুচিত করতে চাইছে। তাদের যুক্তি হলো, প্রচলিত যুদ্ধের আইনই এআই-এর জন্য যথেষ্ট। কিন্তু অ্যানথ্রোপিকের মতে, এআই অন্য সব হার্ডওয়্যারভিত্তিক অস্ত্রের চেয়ে আলাদা; এটি প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হয় এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাইবার হামলা বা বোমাবর্ষণের ছক কষতে পারে। এই আদর্শিক লড়াইয়ে পেন্টাগন যখন অ্যানথ্রোপিককে 'উইক' (Woke) বা অতি-সতর্ক তকমা দিয়ে একঘরে করার চেষ্টা করছে, তখন যুদ্ধের নৈতিকতা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এই বিতর্কের গভীর স্তরে রয়েছে 'লেথাল অটোনমাস ওয়েপন সিস্টেম' (LAWS) এবং চীন-আমেরিকা শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। চীন যেখানে কোনো নৈতিক বাধা ছাড়াই এআই-কে গণ-নজরদারি ও ভিন্নমতাবলম্বী দমনে ব্যবহার করছে, সেখানে পেন্টাগন মনে করে কোনো বিধিনিষেধ আমেরিকাকে এই দৌড়ে পিছিয়ে দেবে। এই সুযোগে স্যাম অল্টম্যানের ওপেনএআই (OpenAI) অত্যন্ত কৌশলী ভূমিকা পালন করেছে। অ্যানথ্রোপিক যখন নীতিগত অবস্থানে অনড়, ওপেনএআই তখন পেন্টাগনের সাথে দ্রুত চুক্তি করে নিজেদের 'দেশপ্রেমিক প্রযুক্তিবিদ' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এর ফলে সিলিকন ভ্যালির মেধাবী প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের মধ্যেও বিভাজন তৈরি হয়েছে। একদল ঝুঁকেছে অ্যানথ্রোপিকের মতো সুরক্ষা-কেন্দ্রিক কোম্পানির দিকে, অন্যদল বিশাল বেতনের বিনিময়ে পেন্টাগন-ঘনিষ্ঠ কোম্পানিগুলোতে যোগ দিয়ে এআই-কে শক্তিশালী মারণাস্ত্রে রূপান্তরের নেশায় মেতেছে।

সিলিকন ভ্যালি এখন আর কেবল সফটওয়্যার তৈরির শান্ত কোনো জায়গা নয়, এটি এখন ওয়াশিংটনের ক্ষমতার দাবার ঘুঁটি। ইলন মাস্কের মতো ব্যক্তিত্বরা প্রশাসনের সাথে সরাসরি কাজ করায় অনেক কোম্পানি এখন টক্কর দেওয়ার বদলে সমঝোতার পথ বেছে নিচ্ছে। এই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে অ্যানথ্রোপিক এক 'বিদ্রোহী'র ভূমিকা নিয়েছে, যা তাদের একাংশের কাছে জনপ্রিয় করলেও সরকারের কাছে করে তুলেছে 'বিপজ্জনক'। ২০২৬ সালের এই ঘটনাটি কেবল একটি দীর্ঘমেয়াদী আইনি লড়াইয়ের সূচনা মাত্র। আদালতের রায়ে নির্ধারিত হবে—প্রযুক্তির উদ্ভাবন কি কেবল কোডিং এবং অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভর করবে, নাকি তা ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে মাথা নত করবে। রণক্ষেত্রে এআই-এর এই জয়যাত্রা আসলে মানবিক সহমর্মিতা ও বিচারবুদ্ধির এক চরম অগ্নিপরীক্ষা।

রিপোর্টার্স২৪/এসসি

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪