স্টাফ রিপোর্টার: অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা বিচার বিভাগ ও সংসদ সচিবালয়সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ চারটি অধ্যাদেশ রহিত করার সুপারিশ ঘিরে জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিষয়গুলো আরও গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করার পক্ষে মত দিয়েছেন সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা (এমপি)।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে সরকার দলীয় সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তী বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ রহিতকরণ ও হেফাজতের জন্য বিল আনার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও নেতিবাচক সমালোচনা তৈরি হয়েছে বলে সংসদ সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৈঠকে বলেন, “জনগণ আমাদের ওপর যে আস্থা রেখেছে, তার প্রতিদান দিতে হবে কাজের মাধ্যমে। সংসদের প্রতিটি মিনিট অত্যন্ত মূল্যবান। কোনো প্রকার ব্যক্তিগত স্বার্থ বা অবহেলা বরদাশত করা হবে না। আমরা একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়তে অঙ্গীকারবদ্ধ।”
সভায় সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা মত দেন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠন এবং অধস্তন আদালতের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে একটি স্বতন্ত্র ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। এসব ব্যবস্থা বাতিল করা হলে জনগণের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এ কারণে আইনগুলো চূড়ান্তভাবে পাসের আগে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া এবং জনমতের প্রতিফলন ঘটানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
উল্লেখ্য, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরাও এই দুটি অধ্যাদেশ হুবহু বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। বিশেষ কমিটিতে দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্টে’ তারা উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো বিচার বিভাগকে আরও শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত।
এদিকে বিচার বিভাগ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলেও এই বিষয়টি নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। অধস্তন আদালতের বিচারকদের একটি বড় অংশ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এছাড়া বিশ্লেষক ও সুশাসন সংক্রান্ত সংস্থাগুলোর মতে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা-সম্পর্কিত অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ বিচার ব্যবস্থার সংস্কার প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কাও সামনে এসেছে।
সভায় অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়। এর মধ্যে রয়েছে— অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশকে স্থায়ী আইনে রূপান্তরের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা, সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা, এবং ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার নির্দেশ প্রদান।
বৈঠকে সংসদ উপনেতা ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বর্তমান সংসদীয় কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরেন।
সভা-পরবর্তী পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি দিকনির্দেশনার ফলে দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে নতুন উদ্যম ও চাঙ্গাভাব তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ আইন প্রণয়ন কার্যক্রমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব