স্টাফ রিপোর্টার: দেশের ব্যাংকিং খাতে মূলধন সংকট উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ২৩টি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা, যা তিন মাস আগেও ছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এই সময়ে ঘাটতি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী, ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে নির্ধারিত ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু কোনো ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন এই সীমার নিচে নেমে গেলে মূলধন ঘাটতি তৈরি হয়, যা মূলত খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, প্রভিশন ঘাটতি ও আর্থিক ক্ষতির কারণে সৃষ্টি হয়।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংকের মোট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতের ৯টি ব্যাংকে এই ঘাটতি ৩৬ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে, যেখানে ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮২২ কোটি টাকা। এছাড়া দুই বিশেষায়িত ব্যাংকের ঘাটতি ৩২ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ, দুর্বল নজরদারি ও প্রভাবভিত্তিক ঋণ অনুমোদনের সংস্কৃতির কারণে ব্যাংক খাত এই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়েছে। মূলধন ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নেও চাপ তৈরি হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হওয়ায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা, যা মূলধন সংকটকে আরও গভীর করেছে।
এদিকে ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার সূচক (সিআরএআর) নেমে এসেছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৯০ শতাংশে, যেখানে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এটি কমপক্ষে ১০ শতাংশ থাকা প্রয়োজন। তিন মাস আগেও এ সূচক ছিল ইতিবাচক ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, মূলধন দুর্বল হলে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অর্থায়ন পেতেও সমস্যা দেখা দেয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সংকট উত্তরণে দ্রুত আইনি নিষ্পত্তি, কার্যকর ব্যাংক রেজুলেশন কাঠামো এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বিশ্বব্যাংক-এর সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, মূলধন ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে। অনেক ব্যাংক এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির সঙ্গে প্রভিশন সংরক্ষণের চাপও বাড়ছে। পর্যাপ্ত মুনাফা না হওয়ায় প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত মূলধন সংকটে রূপ নিচ্ছে।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি