কুমিল্লা প্রতিনিধি: কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলাজুড়ে কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি (টপসয়েল) কেটে নেওয়ার অবৈধ কার্যক্রম থামছেই না। প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র আইনের তোয়াক্কা না করে প্রতিদিনই ফসলি জমি ধ্বংস করে মাটি উত্তোলন ও বিক্রি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার হাসনাবাদ, বাইশগাঁও ইউনিয়নের দক্ষিণ মানরা, শাকতলা, রামদেবপুর, মনিপুর, শ্রীপুর, নয়নপুর, কমলপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিকেল থেকে শুরু করে ভোর পর্যন্ত ট্রাক ও ট্রাক্টরের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি কেটে তা ট্রাক্টরের মাধ্যমে ইটভাটাসহ বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, একটি সিন্ডিকেট কম দামে জমির মাটি কিনে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করছে। প্রতি ট্রাক্টর মাটি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় সংগ্রহ করে তা ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এতে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জমির উর্বরতা মারাত্মকভাবে নষ্ট হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষক জানান, পাশের জমির মাটি কেটে নেওয়ায় তাদের জমিতে পানি জমে থাকা বা পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও নিচু জমিতে অতিরিক্ত পানি নেমে গিয়ে কৃষিকাজ অসম্ভব হয়ে পড়ছে। বাধ্য হয়ে কেউ কেউ নিজের জমির মাটিও বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা জানায়, রাস্তার ওপর মাটি পড়ে থাকায় যানবাহনের চলাচলে ধুলার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে চলাচলে অসুবিধা এবং শ্বাসকষ্টের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিচ্ছে।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, কৃষিজমির উপরিভাগের ৬ থেকে ১০ ইঞ্চি অংশে জৈব উপাদান থাকে, যা ফসল উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই স্তর অপসারণ করা হলে জমির উৎপাদন ক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে হ্রাস পায়।
এ বিষয়ে সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মো. দিদারুল আলম বলেন, “সরেজমিনে গিয়ে মাটি কাটা বন্ধ করা হয়েছে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।” তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কর্মকর্তারা চলে যাওয়ার পরপরই আবারও মাটি কাটার কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়।
আইন অনুযায়ী, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১২) এবং ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৮৯ (সংশোধিত ২০১৩) অনুযায়ী কৃষিজমির টপসয়েল কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা জরিমানা ও ২ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। পুনরাবৃত্তি হলে ১০ লাখ টাকা জরিমানা ও ১০ বছরের কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
এদিকে এলাকাবাসী জানায়, ১৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হলে তিনি থানায় যোগাযোগ করতে বলেন। পরবর্তীতে মনোহরগঞ্জ থানার ওসিকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, পরিবেশ রক্ষা ও কৃষিজমি ও গ্রামীণ অবকাঠামো সুরক্ষায় দ্রুত কার্যকর অভিযান পরিচালনা করে এই অবৈধ মাটি কাটার কার্যক্রম বন্ধ করা হোক।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম