ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: উপসাগরীয় যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকের (মেমোরেন্ডাম) ফাঁস হওয়া খসড়ার বিভিন্ন সংস্করণে ইরানের জন্য বেশি সুবিধা রাখা হয়েছে বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এসব প্রতিবেদনকে ‘ভুয়া খবর’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
পশ্চিমা, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, ফাঁস হওয়া খসড়ার বিভিন্ন সংস্করণে দীর্ঘ আলোচনার সময় তেহরানের উত্থাপিত প্রধান শর্তগুলো প্রতিফলিত হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি সেখানে অনুপস্থিত।
যদিও সংশ্লিষ্ট সব সূত্রই বলেছে, চুক্তির ভাষা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বিশেষ করে লেবাননে যুদ্ধবিরতি নিয়ে ভাষা নির্ধারণের বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত রয়েছে। ইরান চায়, তাদের মিত্র হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযান বন্ধ করা হোক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরান যেসব শর্ত ফাঁস করেছে এবং ভুয়া সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তার সঙ্গে লিখিতভাবে সম্মত হওয়া শর্তের কোনো সম্পর্ক নেই। ইরানিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাদের সঙ্গে আলোচনা করা খুবই অসম্মানজনক।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, সমঝোতা স্মারকটি বাস্তবায়নের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে চূড়ান্ত হওয়ার আগে এর বিষয়বস্তু নিয়ে জল্পনা-কল্পনা না করার আহ্বান জানান তিনি।
রয়টার্সের হাতে থাকা খসড়া অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ তুলে নিলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অবমুক্ত সম্পদ থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড়ের প্রক্রিয়া শুরু করবে এবং দেশটির তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে।
চূড়ান্ত সমাধানের লক্ষ্যে পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা হবে। আপাতত পারমাণবিক নীতির ক্ষেত্রে শুধু পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ইরানের বিদ্যমান অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার কথা উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া ইরানের ক্ষয়ক্ষতির জন্য শত শত বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ নিয়ে আলোচনা এবং দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের দীর্ঘদিনের মার্কিন দাবিও খসড়ায় অনুপস্থিত বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।
এর আগে ওয়াশিংটন ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ত্যাগের দাবি জানালেও রয়টার্স পর্যালোচনা করা কোনো খসড়াতেই এ বিষয়ে উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
তবে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ধ্বংস ও সরিয়ে ফেলা হবে এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ইরান তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত কোনো অর্থ ছাড় করা হবে না। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং ইরান সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন বন্ধ করবে। এটি একটি কার্যসম্পাদন-নির্ভর চুক্তি।
একটি পশ্চিমা সূত্র জানিয়েছে, চুক্তির ভাষা নিয়ে সমঝোতা হলে আগামী রোববারই এতে স্বাক্ষর হতে পারে। সম্ভাব্য স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ। সুইজারল্যান্ডের জেনেভাকে সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জেডি ভ্যান্সও বলেছেন, চুক্তিটি এমনভাবে সাজানো হচ্ছে যাতে ইরান কেবল তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করলেই অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে।
যুদ্ধ শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে অভিযান চালালেও বর্তমান আলোচনায় ইসরায়েলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ইসরায়েল এ সমঝোতা স্মারকের অংশ হবে না।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে লেবাননে সামরিক অভিযান সীমিত করার মার্কিন চাপ নিয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে একাধিকবার মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, লেবাননের দখল করা এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না দেশটি।
সমঝোতার সম্ভাবনার খবরে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে এবং তেলের দাম প্রায় দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ শতাংশের বেশি কমেছে।
তবে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা এখনও অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার দুটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে মার্কিন বাহিনী। একই সময়ে ইরানের সেনাবাহিনী একটি তেলবাহী জাহাজকে প্রণালি অতিক্রমে বাধা দিয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি