শিমুল চৌধুরী ধ্রুব: শীত এলেই বাংলার গ্রামজীবনে ফিরে আসে খেজুরের রস আর গুড়ের সুবাস। তবে সব গুড়ের মধ্যে আলাদা মর্যাদা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকার ঐতিহ্যবাহী হাজারি গুড়। সাধারণ খেজুরের গুড়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হওয়া এই গুড়ের প্রতি কেজির দাম বর্তমানে প্রায় দুই হাজার টাকা। শুধু স্বাদের জন্য নয়, শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য, জটিল উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং সীমিত উৎপাদনের কারণেই এটি দেশের অন্যতম মূল্যবান ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্যে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার মধ্য দিয়ে হাজারি গুড়ের এই ঐতিহ্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও পেয়েছে।
দুই শতকের ঐতিহ্য
মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা, বাল্লা, গোপীনাথপুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে তৈরি হয়ে আসছে হাজারি গুড়। স্থানীয় গাছি ও কারিগর পরিবারের কাছে এটি শুধু একটি পণ্য নয়, বরং বংশপরম্পরায় চলে আসা একটি শিল্প। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই কৌশল ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা এই গুড় তৈরি করে আসছেন।
এই গুড়ের স্বাদ, সুগন্ধ এবং বিশেষ গঠনই তাকে অন্য সব খেজুরের গুড় থেকে আলাদা করেছে। হাতে নিয়ে সামান্য চাপ দিলেই এটি গুঁড়া গুঁড়া হয়ে যায়, যা হাজারি গুড়ের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) ঝিটকার হাজারি গুড়কে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে। এর ফলে এই ঐতিহ্যবাহী পণ্যের ভৌগোলিক পরিচয় আইনি সুরক্ষা পেয়েছে এবং নকল পণ্য প্রতিরোধের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কী থেকে তৈরি হয় হাজারি গুড়?
হাজারি গুড় তৈরি হয় সাধারণ খেজুরগাছের রস থেকেই। তবে এর বিশেষত্ব কাঁচামালে নয়, বরং উৎপাদনের অনন্য পদ্ধতিতে।
শীতের রাতে গাছিরা খেজুরগাছে মাটির হাঁড়ি বেঁধে রস সংগ্রহ করেন। ভোর হওয়ার আগেই সেই রস নামিয়ে এনে ছেঁকে জ্বাল দেওয়া হয়। কিন্তু সাধারণ গুড়ের মতো একসঙ্গে অনেক রস জ্বাল দিয়ে কাজ শেষ হয় না। প্রতিটি হাঁড়ির রস আলাদা করে যত্নসহকারে প্রক্রিয়াজাত করতে হয়। এক কেজি হাজারি গুড় তৈরিতে প্রায় ১২ কেজি খেজুরের রস প্রয়োজন হয়। দীর্ঘ সময় ধরে রস জ্বাল দেওয়ার পর পরিষ্কার কাপড়ে ছেঁকে তা একটি বিশেষ মাটির পাত্রে রাখা হয়, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘জালা’।
গুড় তৈরির কারিশমা
হাজারি গুড় তৈরির সবচেয়ে কঠিন ধাপটি শুরু হয় জালায় রস ঢালার পর। পাত্রের দুই পাশে বসে দুইজন কারিগর কাঠ কিংবা তালের লাঠি দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে রস নাড়তে থাকেন। শত শত বার এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হয়।
ধীরে ধীরে রসের রং পরিবর্তিত হয়ে হালকা বাদামি আভা ধারণ করে এবং তৈরি হয় এক বিশেষ ধরনের দানাদার, সুগন্ধি গুড়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন অসীম ধৈর্য, পরিশ্রম ও দক্ষতা। স্থানীয়দের মতে, সামান্য ভুল হলেও কাঙ্ক্ষিত মানের হাজারি গুড় তৈরি সম্ভব নয়। কারিগরদের ভাষায়, ধৈর্য, সততা এবং কঠোর শ্রমই শত বছরের এই সুনাম ধরে রেখেছে।
কেন এত দাম?
অনেকের কাছেই প্রশ্ন, হাজারি গুড়ের কেজি দুই হাজার টাকা কেন? এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি কারণ। প্রথমত, উৎপাদন অত্যন্ত সীমিত। দ্বিতীয়ত, এক কেজি গুড় তৈরিতে বিপুল পরিমাণ রস প্রয়োজন হয়। তৃতীয়ত, পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া হাতে করতে হয় এবং এতে প্রচুর সময় ও শ্রম লাগে।
গোপীনাথপুর গ্রামের কারিগর মোজাফ্ফর হোসেন জানান, তাদের পরিবারে দাদা বেলায়েত মোল্লার সময় থেকে হাজারি গুড় তৈরি হচ্ছে। বিশেষ উৎপাদন পদ্ধতির কারণেই এই গুড়ের দাম বেশি। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি প্রায় দুই হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কারা খায়, কোথায় যায়?
হাজারি গুড়ের চাহিদা শুধু মানিকগঞ্জ বা আশপাশের জেলাতেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্রেতারা সরাসরি উৎপাদন এলাকায় এসে এই গুড় সংগ্রহ করেন। অনেক সময় কয়েক মাস আগেই অর্ডার দিয়ে রাখতে হয়।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, একসময় এই গুড় বিদেশেও রপ্তানি হতো এবং এখনও প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যায়।
এলাকায় একটি জনপ্রিয় জনশ্রুতিও প্রচলিত রয়েছে। বলা হয়, ইংল্যান্ডের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ একসময় এই গুড়ের স্বাদ গ্রহণ করে প্রশংসা করেছিলেন। যদিও এ বিষয়ে কোনো লিখিত বা ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবুও গল্পটি স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে।
জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার ফলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে এই গুড় রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা করছেন স্থানীয় উৎপাদকরা।
গাছিদের কঠোর জীবন
হাজারি গুড় তৈরির পেছনে রয়েছে গাছিদের নিরলস পরিশ্রম। গোপীনাথপুর গ্রামের কারিগর মোহাম্মদ রসেল জানান, ভোরের আজানের আগেই তাদের ঘুম ভাঙে। মোটা কাপড় গায়ে জড়িয়ে ৪০ থেকে ৪৫টি খেজুরগাছে উঠে রসের হাঁড়ি নামাতে হয়। এরপর বাড়িতে এনে শুরু হয় রস ছাঁকা ও জ্বাল দেওয়ার কাজ।
গৃহিণী সুফিয়া বেগম বলেন, ভোরে গাছিদের ডেকে তোলা থেকে শুরু করে চুলা প্রস্তুত, রস ছেঁকে জ্বাল দেওয়া, গুড় তৈরি এবং শেষে হাঁড়ি ধোয়া—সবকিছুতেই পরিবারের নারীদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে।
গাছি আমজাদ হোসেন জানান, প্রতিটি হাঁড়ি নিমপাতা দিয়ে গরম পানিতে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করা হয়। তিন দিন টানা রস সংগ্রহের পর পাঁচ দিন গাছকে বিশ্রাম দেওয়া হয়। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় নাড়া ও কাশবন।
হাজারি গুড়ের আদিকথা
হাজারি গুড়ের উৎপত্তি নিয়ে এলাকায় একটি লোককথাও প্রচলিত রয়েছে। কথিত আছে, এক দরবেশের আশীর্বাদে এক গাছির খালি হাঁড়ি অলৌকিকভাবে রসে ভরে যায়। সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয়েছিল অসাধারণ স্বাদের গুড়। এরপর থেকেই নাকি হাজারি গুড়ের যাত্রা শুরু। যদিও এর ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই, তবে স্থানীয় লোকসংস্কৃতির অংশ হিসেবে এই গল্প আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা
হাজারি গুড়ের জনপ্রিয়তা বাড়লেও উৎপাদন কমছে। একসময় শত শত পরিবার এই পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন মাত্র ২০ থেকে ২৫টি পরিবার টিকে আছে। এর পেছনে রয়েছে খেজুরগাছের সংখ্যা কমে যাওয়া, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শীতের তীব্রতা কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত কুয়াশার মতো নানা সমস্যা।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, পরিকল্পিতভাবে খেজুরগাছ রোপণ ও কারিগরদের সহায়তা না করা হলে একদিন হাজারি গুড় কেবল ইতিহাসের বিষয় হয়ে উঠবে।
জিআই স্বীকৃতি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার ফলে হাজারি গুড়ের ভৌগোলিক পরিচয় সংরক্ষিত থাকবে। নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাইরে তৈরি পণ্য এই নামে বাজারজাত করা কঠিন হবে। ফলে নকল পণ্যের বিস্তার কমবে এবং প্রকৃত উৎপাদকরা ন্যায্য মূল্য পাবেন।
মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, "লোকসংগীত আর হাজারি গুড় মানিকগঞ্জের প্রাণের সুর। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফল হিসেবে এই স্বীকৃতি এসেছে। এটি আন্তর্জাতিক বাজারে মানিকগঞ্জের হাজারি গুড়কে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্য হিসেবে বিশ্বে নতুন পরিচিতি গড়ে তুলবে।"
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব