আশিস গুপ্ত:
রাশিয়ার সামনে এখন এমন এক কঠিন সংকট হাজির হয়েছে, যা কেবল বোমা বর্ষণ করে পার পাওয়ার কোনো পথ নেই। ইরানের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক উত্তেজনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যেমন বড় ধাক্কা দিয়েছে, তেমনি পুরো বিশ্বকে এক 'উত্তর-আমেরিকান' যুগের দিকে দ্রুত ঠেলে দিচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এই বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে ক্রেমলিন হয়তো কোনো বড় ভূ-রাজনৈতিক বাজিমাত করবে, কিন্তু মস্কোর জন্য আসল হিসাবটা মোটেও এত সরল নয়। তেলের আন্তর্জাতিক বাজার চড়ে যাওয়ায় পেট্রোডলারের জোয়ারে পুতিনের রাজকোষ হয়তো সাময়িকভাবে ফুলেফেঁপে উঠেছে, কিন্তু এই সাময়িক আর্থিক লাভের আড়ালে রাশিয়াকে হারাতে হচ্ছে তার দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বড় ভরসাগুলো। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে গত কয়েক বছর ধরে পুতিন যে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ তা এক ঝটকায় তছনছ করে দিয়েছে।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ পারস্য উপসাগর। ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে বিতাড়িত রুশ ধনকুবের, রাজনীতিবিদ, অফশোর কর্মী আর বাণিজ্যের জন্য এই অঞ্চলটি ছিল রাশিয়ার এক অঘোষিত অভয়ারণ্য। উপসাগরীয় নেতারা পর্দার আড়ালে ইউক্রেন ও মার্কিন প্রতিনিধিদের সাথে রাশিয়ার হয়ে মধ্যস্থতা করছিলেন। তার ওপর ইরান ছিল রাশিয়ার এক বিশ্বস্ত আঞ্চলিক ভারসাম্য, যা পুতিনের ঘরের ভেতরের সুন্নি মুসলিম জনসংখ্যার বিপরীতে এক নীরব ধর্মীয় প্রাচীর তৈরি করে রেখেছিল। এমনকি ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে যখন কিয়েভের ড্রোনের সামনে রুশ বাহিনী দিশেহারা, তখন এই ইরানই 'শাহেদ' ড্রোন দিয়ে পুতিনকে জীবনদান করেছিল। আজ এই যুদ্ধ মস্কোর সেই পরম বন্ধুদের একে একে গ্রাস করছে। ২৫ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক সঙ্গী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীর প্রয়াণ এবং ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের অবসান পুতিনকে মানসিকভাবে একা ও শঙ্কিত করে তুলেছে। সিরিয়ায় আসাদের পতন আর ভেনেজুয়েলায় মাদুরোর অপহরণের পর পুতিনের নির্ভরযোগ্য বন্ধুদের বৃত্ত এখন এতটাই ছোট যে, আসাদকে এখন স্রেফ প্রাণ বাঁচাতে মস্কোর আশ্রয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।
ইউক্রেন আর পারস্য উপসাগরের এই দুই যুদ্ধের মধ্যে এক অদ্ভুত কাঠামোগত মিল রয়েছে। রাশিয়া যেমন ইউক্রেনকে নিজেদের ঘরের মাটি মনে করে, অথচ তা বরাবরই এক অশান্ত সীমান্ত; ঠিক তেমনি আমেরিকাও ৮০ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ত্রাতা সাজতে গিয়ে নিজের ফাঁদ নিজেই তৈরি করেছে। তবে তফাত হলো, ইউক্রেন রাশিয়ার জন্য কখনো সরাসরি অস্তিত্বের হুমকি ছিল না, যা ইরান আমেরিকার জন্য ছিল। কিন্তু পরিণতি সেই একই—এক দুর্বল শক্তি এক পরাশক্তিকে এক অন্তহীন, ব্যয়বহুল যুদ্ধের জালে আটকে ফেলেছে। ইরান যেভাবে আমেরিকাকে মধ্যপ্রাচ্যে টেনে হিঁচড়ে ব্যস্ত রেখেছে, ঠিক তেমনি ইউক্রেনও রাশিয়ার ঘাড়ে এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর চাপ তৈরি করেছে যা পুতিনের অর্থনীতির কোমর ভেঙে দিচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাশিয়ার মে মাসের বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ নির্বিঘ্ন করতে যখন ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় তিন দিনের এক যুদ্ধবিরতির ভিক্ষা নিতে হয়, তখন পুতিনের বাঙ্কার-বন্দি দুর্বলতা বিশ্বমঞ্চে আর গোপন থাকে না।
অথচ ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো হয়তো বুঝতেই পারেননি যে, ইউক্রেন আজ যুদ্ধক্ষেত্রের আধুনিক প্রযুক্তি ও ড্রোনের ব্যবহারে কতটা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প বরাবরই কোনো স্থায়ী সমাধান না খুঁজে স্রেফ লোকদেখানো বৈঠক আর পুতিনের সাথে প্রতীকী ছবি তুলে সস্তা জয় দাবি করতে ভালোবাসেন। তিনি বারবার জেলেনোস্কিকে একতরফা জমি ছেড়ে দেওয়ার চাপ দিলেও, ইউক্রেন খুব ভালো করেই জানে পুতিন-ট্রাম্পের এই গোপন আঁতাত কোনো শান্তি আনবে না। তাই তারা এখন হোয়াইট হাউসের ভরসা ছেড়ে ইউরোপীয় মিত্র এবং পারস্য উপসাগরের দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছে, যারা ইউক্রেনের আধুনিক ড্রোন যুদ্ধকৌশল নিজেদের আয়ত্তে নিতে মরিয়া। সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের এই অতি-উৎসাহই পুতিনের কফিনের শেষ পেরেক হতে যাচ্ছে। পুতিন ভেবেছিলেন ট্রাম্প এসে তাকে ইউক্রেনে একতরফা জয় উপহার দেবেন, কিন্তু ট্রাম্প যত বেশি ইরানকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন, পুতিনকে জেতানোর সুযোগ তার ততটাই হাতছাড়া হবে। আক্ষরিক অর্থেই, মার্কিন প্রেসিডেন্ট আর পুতিনের 'ট্রাম্প কার্ড' থাকছেন না।
এদিকে রাশিয়াও চিরকাল এই যুদ্ধের খরচ টানতে পারবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেয়েও বেশি সময় ধরে রাশিয়া আজ ইউক্রেনের মাটিতে আটকে আছে। সামান্য কিছু জমি দখলের জন্য শুধুমাত্র এক মাসেই রাশিয়ার প্রায় ৩৫,০০০ সৈন্যের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা তাদের প্রতি মাসের নতুন রিক্রুটের সমান। এটি কোনো সাধারণ অচলাবস্থা নয়, বরং এমন এক 'ডেডলক' যেখানে দুই পক্ষেরই মরণ কামড় দেওয়ার ক্ষমতা আছে, কিন্তু কেউ আগে পিছু হটতে রাজি নয়। তবে এই অন্তহীন ধ্বংসযজ্ঞ থামাতে হলে যেকোনো এক পক্ষকে ভাঙতেই হবে। ইতিমধ্যেই রাশিয়ার অর্থনীতিতে ধসের স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, পুতিনের জনপ্রিয়তার গ্রাফ নামছে নিচের দিকে। রাশিয়ার একসময়ের পরম মিত্র আর্মেনিয়া ও কাজাখস্তান এখন মস্কোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে স্বাধীন চুক্তি করছে, এমনকি আফ্রিকা থেকেও রুশ বাহিনী বিতাড়িত হচ্ছে। এককালের পরাশক্তি রাশিয়া আজ নিজেই নিজের জালে বন্দি হয়ে এক গভীর অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে মারাত্মক আঘাতটি এসেছে লজিস্টিকস বা রসদ সরবরাহের লাইনে, যা ইউক্রেন অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও গোপনে পরিচালনা করছে। গত কয়েক মাস ধরে কিয়েভ রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় যুদ্ধযন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার একমাত্র মহাসড়কটি নিঃশব্দে ধ্বংস করে চলেছে। এই পথটি রাশিয়ার জন্য এতটাই লাইফলাইন যে, এটি ছাড়া ক্রিমিয়া পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে এবং সম্মুখ সমরের পরিখাগুলো অচল হয়ে যাবে। ইউক্রেন এখন এই অভিযানকে একটি আনুষ্ঠানিক কৌশলগত 'লজিস্টিকস লকডাউন' হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো 'আর-২৮০' মহাসড়ক, যা রুশ দখলদাররা নাম দিয়েছিল 'নোভোরোসিয়া' রুট। কের্চ স্ট্রেইট ব্রিজটি ইউক্রেনীয় হামলায় আগেই পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পর, রোস্তভ-অন-ডন থেকে মারিউপোল ও মেলিতোপোল হয়ে ক্রিমিয়া যাওয়ার এই একমাত্র স্থলপথটিই ছিল রাশিয়ার শেষ ভরসা। আর ইউক্রেন এখন এই পথটিকে একটি জ্বলন্ত অগ্নিগর্ভ করিডোরে পরিণত করেছে।
এই যুদ্ধের গণিত বড় নিষ্ঠুর। সামরিক বিশ্লেষকরা দেখিয়েছেন, মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে এই মহাসড়কে ৪৮৩টি রুশ গোলাবারুদবাহী ট্রাক, জ্বালানি ট্যাংকার ও ভারী পরিবহন যান ধ্বংস করা হয়েছে। রাশিয়া প্রতি মাসে হাজার হাজার যান প্রতিস্থাপনের ক্ষমতা রাখে না। কারখানা থেকে সীমান্ত পর্যন্ত ট্রেনে করে রসদ আসলেও, চূড়ান্ত ফ্রন্টলাইনে যাওয়ার জন্য এই অভিশপ্ত মহাসড়ক ব্যবহার করতেই হবে। এর সরাসরি ফল হিসেবে ক্রিমিয়ায় এখন তীব্র জ্বালানি সংকট এবং কঠোর পেট্রোল রেশন চলছে, আর উত্তর সীমান্তের পরিখায় থাকা রুশ সেনারা গোলাবারুদ ও ডিজেলের অভাবে না খেয়ে মরার মতো অবস্থায় পড়েছে।
এই পুরো অবিশ্বাস্য নিখুঁত অপারেশনের নেপথ্যে কাজ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত 'হরনেট' ড্রোন। সম্মুখ যুদ্ধক্ষেত্রের ১০০ মাইলেরও বেশি গভীরে গিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আঘাত হানতে সক্ষম এই প্রযুক্তির আসল শক্তি হলো এর পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। রাশিয়ার ট্র্যাডিশনাল ইলেকট্রনিক জ্যামিং ব্যবস্থা মূলত পাইলট ও ড্রোনের রেডিও সিগন্যাল কেটে দিয়ে কাজ করে। কিন্তু ইউক্রেনের এই নতুন ড্রোনগুলো স্টারলিংক স্যাটেলাইট ব্যবহার করে অথবা লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছে অন-বোর্ড এআই-এর মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিজের মগজ খাটিয়ে উগ্র থাবা বসায়। ফলে রাশিয়ার হাইওয়েতে মোতায়েন করা দামী দামী জ্যামিং ডিভাইসগুলো স্রেফ অকেজো লোহার টুকরোয় পরিণত হয়েছে। এই ড্রোনের কোনো সিগন্যালের পরোয়া নেই, তার শুধু একটা টার্গেট দরকার। রাশিয়ার কোনো জ্যামিং প্রযুক্তি এদের থামাতে পারছে না, কারণ এই ড্রোনগুলো এখন নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারে। আর ঠিক এই কারণেই, রাশিয়া আজ এমন এক চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে আছে, যা থেকে স্রেফ শক্তি প্রয়োগ বা বোমা বর্ষণ করে বেরিয়ে আসার কোনো পথ খোলা নেই।
আশিস গুপ্ত : সিনিয়র সাংবাদিক,দিল্লি