নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি: পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি (কম্প্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস) সরবরাহ বন্ধ রয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলার ৩০টি জ্বালানি ফিলিং স্টেশনে। পুরো জেলায় মাত্র সরবরাহ অব্যাহত থাকা মাত্র তিনটি পাম্পের একটি মাস সিএনজি ওয়ার্কার্স লিমিটেডে তাই যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। সিএনজিচালিত এসব যানবাহনের লাইনে স্টেশন ছাড়িয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কও ছাড়িয়ে যেতে দেখা যায়।
দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষমান যান চালক ও ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা জানালেন, গত কয়েকদিন ধরেই গ্যাস সংকটে ভুগছেন তারা। বিতরণ লাইন থেকে স্টেশনে পর্যাপ্ত সিএনজি সরবরাহ না থাকায় গ্রাহক পর্যায়ে বিক্রি করা যাচ্ছে না।
এতে আয় কমে যাচ্ছে বলে জানালেন ভাড়ায় গাড়ি চালানো কয়েকজন ব্যক্তি। তারা বলছেন, কয়েকটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দীর্ঘদিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর গ্যাস নিতে হচ্ছে।
কয়েকটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে এমন তথ্যের সত্যতাও মিলেছে। ফিলিং স্টেশন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গত কয়েক দিন ধরে বিতরণ লাইনে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। কোথাও কোথাও কয়েক ঘণ্টা পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হচ্ছে।
নগরীর সস্তাপুর এলাকার মাস সিএনজি ওয়ার্কার্স লিমিটেড নামে ফিলিং স্টেশন থেকে সিএনজি-চালিত অটোরিকশায় নিয়মিত গ্যাস নেন মো. সালাউদ্দিন। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পথের এই অটোরিকশা চালক গতরাতে এসেও গ্যাস না পেয়ে ফেরত গেছেন। পরে সকাল সাতটার দিকে এসে দেড়টা পর্যন্ত লাইনেই অপেক্ষা করছেন বলে জানালেন।
সালাউদ্দিন বলেন, “সকাল থেকে গাড়ি নিয়া বাইর হইতে পারলাম না। গত কয়েকদিন ধইরাই এই অবস্থায়। গ্যাস ঠিকমতো পাইলে হাজার-বারোশ’ কামাই। মালিকরে জমা দিয়া তখন কিছু থাকে। কিন্তু আইজ গ্যাস পাইলে হয়।”
এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময়ও যানবাহনের লাইনেই ছিলেন তিনি। তার সামনে আরও কয়েকটা যানবাহন ছিল অপেক্ষমান। পেছনের লাইন ছিল আরও দীর্ঘ।
এ ফিলিং স্টেশনের কর্মকর্তা প্রকৌশলী কাজী রাকিবুল ইসলাম বলেন, গত তিন-চার দিন ধরে বিতরণ লাইনে গ্যাসের চাপ একেবারেই কম। চাপ না থাকায় মেশিন চালানো যাচ্ছে না। ফলে গ্রাহকদেরও চাহিদামতো গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
গত রাতে অন্তত পাঁচ ঘন্টা গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ ছিল। সকালে গ্যাসের চাপ বাড়লেও দুপুর নাগাদ না আবার কমে বলে জানান রাকিবুল। তিনি বলেন, “গ্যাস লাইনে অন্তত ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ থাকা লাগে। এখন ১ পিএসআইও নেই।”
তবে, গ্যাসের চাপ এমন থাকবে সে ব্যাপারে সরকারের বা সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে পূর্ব কোনো নোটিশ পাননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ স্টেশন থেকে কিছুটা দূরে সাহাবদ্দিন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে কথা হলে প্রাইভেটকার চালক মো. দুলাল হোসেন বলেন, অন্তত চার ঘন্টা লাইনে থাকার পর স্টেশনের ভেতরে ঢুকতে পেরেছেন।
“গ্যাসের সমস্যাটা খুব দ্রুত সমাধান করে দিক। এটার জন্য রাস্তাঘাটও জ্যাম হয়ে যায়। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকি, মানুষেরও সমস্যা হয়,” সরকারের কাছে দাবি জানান এ চালক।
সাহাবদ্দিন ফিলিং স্টেশনের কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজমুল হুদা বলেন, “গত দুই দিন ধরে লাইনে গ্যাসের চাপ কম। ঢাকার দিকে গ্যাস না থাকায় সেখানকার গাড়িগুলো নারায়ণগঞ্জের দিকে আসায় তাঁদের স্টেশনগুলোতে গাড়ির চাপ আরও বেড়েছে।”
তিনি বলেন, চালকেরা ভালো চাপের গ্যাস পাওয়ার আশায় তাদের স্টেশনে এলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না।
বাংলাদেশ সিএনজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ জোনের সভাপতি সাঈদা আক্তার বলেন, “নারায়ণগঞ্জে ৩৩টি পাম্পের (ফিলিং স্টেশন) মধ্যে ৩০টি পাম্প বন্ধ রয়েছে। চলমান এই গ্যাস সংকট কবে কাটবে, সে বিষয়ে সরকার এখনো আমাদের কোনো তথ্য দেয়নি।”
“সরকারকে আমরা জানিয়েছি, যেন দ্রুত সময়ের মধ্যে এটি ঠিক করা হয়। এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের সঙ্গেও আমরা কথা বলেছি। তারা আমাদের জানিয়েছে, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে এই সংকট কাটিয়ে উঠতে কাজ করছে।”
গ্যাস বিতরণকারী সংস্থা তিতাস গ্যাস কোম্পানির নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক বিপণন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মনজুর আজিজ মোহন বলেন, “আমাদের এলএনজি সরবরাহের প্রধান উৎস এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড গ্যাসিফিকেশন ইউনিট)-এর দু’টি ইউনিটের মধ্যে একটিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। সেটি মেরামত শেষে নতুন করে সংযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এ কারণে গত কয়েক দিন ধরে গ্যাস সরবরাহে স্বল্পতা তৈরি হয়েছে। আমাদের ধারণা, আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে পারে।”
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব