ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার তারাপীঠ মন্দিরের সামনে ‘বিদেশিনী’ নামের একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ছয়জন পুণ্যার্থী দগ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। সোমবার ভোরে পাঁচতলা ওই হোটেলের নিচতলায় আগুন লাগার পর তা দ্রুত বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন।
নিহতরা সবাই শ্রাবণ মাসের বিশেষ পূজা উপলক্ষে তারাপীঠে গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। আগুন লাগার সময় হোটেলের অধিকাংশ অতিথি ঘুমিয়ে ছিলেন। ফলে আগুন ও ধোঁয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই ঘরের মধ্যে আটকা পড়েন। পরে পুলিশ ও দমকলকর্মীরা অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।
ভারতের অন্যতম ধর্মীয় তীর্থস্থান তারাপীঠ মন্দিরের অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার তারাপীঠ শহরে। শ্রাবণ মাসের বিশেষ পূজা উপলক্ষে এ সময় সেখানে বিপুলসংখ্যক পুণ্যার্থীর সমাগম হয়। নিহত ও আহতরাও সেই উপলক্ষে তারাপীঠে গিয়েছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার ভোরের দিকে তারাপীঠ থানার অদূরে অবস্থিত হোটেলটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বিদ্যুতের শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত।
হোটেলটি তারাপীঠ থানার খুব কাছেই হওয়ায় খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ। তারাপীঠ থানার পাশাপাশি রামপুরহাট থানার পুলিশ সদস্যরাও উদ্ধারকাজে যোগ দেন। পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় দমকল বাহিনী।
আগুন লাগার পর মুহূর্তের মধ্যে হোটেলের বিভিন্ন কক্ষে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। অতিথিদের অধিকাংশই তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে শিশুও ছিল। আগুনের পাশাপাশি ঘন কালো ধোঁয়ায় পুরো হোটেল ঢেকে যাওয়ায় অনেকেই প্রথমে পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারেননি।
হোটেলের অতিথি ও কর্মচারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুন অনেকটা ছড়িয়ে পড়েছিল। ফলে কয়েকজন অতিথি নিজেদের কক্ষেই আটকা পড়ে যান। এ সময় হোটেলের ভেতরে আতঙ্ক ও হুড়োহুড়ি শুরু হয়।
হোটেল কর্তৃপক্ষের দাবি, ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বিদ্যুৎ সরবরাহের এনসিবি (মিনিয়েচার সার্কিট ব্রেকার) হঠাৎ ফেটে যায়। সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
হোটেলের মালিক কল্যাণ পাল জানান, রাতপাহারার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা আগুন দেখতে পেয়ে দ্রুত অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র চালু করেন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের তার বিচ্ছিন্ন করে দেন। তবে ততক্ষণে আগুন হোটেলের সাজসজ্জায় ব্যবহৃত ফাইবারজাত বিভিন্ন সামগ্রীতে ছড়িয়ে পড়ে।
কল্যাণ পাল বলেন, কর্মীরা প্রাথমিকভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আগুন বাড়তে থাকে। পরে দমকলকর্মীরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে আগুন নেভানোর পরও হোটেলের বিভিন্ন তলায় ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে।
হোটেল মালিকের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন মূলত নিচতলায় ছড়িয়ে পড়লেও এর ধোঁয়া পাঁচতলা পর্যন্ত উঠে যায়। ধোঁয়ায় হোটেলের ভেতরের পরিবেশ ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
আতঙ্কিত অতিথিরা নিজেদের কক্ষ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা শুরু করেন। কিন্তু ধোঁয়া ও অন্ধকারের কারণে অনেকে নিরাপদ পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। হোটেলের পেছনের দিকে বের হওয়ার একটি দরজা থাকলেও অনেক অতিথি সেটি খুঁজে পাননি। ফলে তারা রিসেপশনের দিক দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন।
এ সময়ই অনেকে আগুনের সংস্পর্শে এসে দগ্ধ হন বলে হোটেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। কেউ কেউ ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে পুলিশ ও দমকলকর্মীরা আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।
অগ্নিকাণ্ডের পর আহতদের দ্রুত রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে আগুনে হোটেলের নিচতলার বিস্তীর্ণ অংশ পুড়ে গেছে। অগ্নিকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলে পুণ্যার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। উদ্ধার হওয়া অতিথিদের অনেকেই ঘটনার আকস্মিকতায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
দমকল বাহিনীর দ্রুত তৎপরতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও আগুন লাগার কারণ এবং হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক ত্রুটিকে আগুনের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে মনে করা হলেও ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত করা হচ্ছে।
শ্রাবণ মাসের বিশেষ পূজা উপলক্ষে তারাপীঠে এ সময় বিপুলসংখ্যক পুণ্যার্থীর সমাগম হয়েছে। এমন সময়ে একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ছয়জনের প্রাণহানির ঘটনায় তীর্থযাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, তীর্থ মৌসুমে হোটেল ও অতিথিশালাগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষ অবস্থান করায় অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে রাতের বেলায় আগুন লাগলে দ্রুত বের হওয়ার পথ, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং নিরাপদ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা না থাকলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।
এদিকে ঘটনার পর হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বৈদ্যুতিক সংযোগ খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগুনের প্রকৃত কারণ এবং হোটেল কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।
সূত্র: আনন্দবাজার, পিটিআই
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম