| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

অযত্ন-অবহেলায় টাঙ্গাইলের ঐতিহাসিক ‘ভাসানী হল’, দিনে পানের দোকান রাতে মাদকের আড্ডা

reporter
  • আপডেট টাইম: অগাস্ট ১৭, ২০২৬ ইং | ১৮:৫৮:৫৯:অপরাহ্ন  |  ১৭৭ বার পঠিত
অযত্ন-অবহেলায় টাঙ্গাইলের ঐতিহাসিক ‘ভাসানী হল’, দিনে পানের দোকান রাতে মাদকের আড্ডা

রঞ্জন কৃষ্ণ পন্ডিত, টাঙ্গাইল: টাঙ্গাইল শহরের একসময়ের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র ঐতিহ্যবাহী ‘ভাসানী হল’ এখন ধুলোবালি, ভাঙাচোরা দেয়াল ও তালাবদ্ধ কক্ষের নিস্তব্ধতায় ঢাকা। দীর্ঘদিনের অযত্ন-অবহেলা, সংস্কারের অভাব ও প্রশাসনিক উদাসীনতায় অর্ধশত বছরের পুরোনো এই মিলনায়তনটি আজ পরিত্যক্ত ভবনে পরিণত হয়েছে। একসময় যেখানে নাটক, সংগীত, নৃত্য, কবিতা, বইমেলা এবং রাজনৈতিক-সামাজিক নানা আয়োজনের প্রাণচাঞ্চল্য ছিল, সেখানে এখন বিরাজ করছে নীরবতা ও অস্বস্তিকর পরিবেশ।

বর্তমানে দিনের বেলায় হলের বারান্দায় বসেছে পানের দোকান। প্রাঙ্গণটি ব্যবহৃত হচ্ছে ট্রাকস্ট্যান্ড হিসেবেও। সন্ধ্যা নামলেই পুরো এলাকা অন্ধকারে ঢেকে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতে সেখানে মাদকসেবী ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের আনাগোনা বাড়ে। এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জানা যায়, টাঙ্গাইল শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রায় ৩৫ শতাংশ জমির ওপর প্রথমে ‘টাঙ্গাইল টাউন হল’ নামে মিলনায়তনটি নির্মাণ করা হয়। ১৯৭৬ সালের ১৬ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতির শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আবুল ফজল এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তৎকালীন জেলা প্রশাসক শেখ হাবিবুল্লাহর উদ্যোগ ও পরিশ্রমে মাত্র দুই বছরে নির্মাণকাজ শেষ হয়। ১৯৭৮ সালের ২ এপ্রিল তৎকালীন ঢাকা বিভাগের কমিশনার খানে আলম খান মিলনায়তনটির উদ্বোধন করেন।

পরবর্তীতে টাঙ্গাইল পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান সামছুল হকের উদ্যোগে সর্বসম্মতিক্রমে এর নাম পরিবর্তন করে ‘ভাসানী হল’ রাখা হয়। এরপর থেকেই এটি টাঙ্গাইলের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

প্রায় এক হাজার আসনের এই মিলনায়তন একসময় দেশের অন্যতম বৃহৎ ও দৃষ্টিনন্দন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। কয়েক দশক ধরে টাঙ্গাইলের নাটক, সংগীত, আবৃত্তি, বইমেলা, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশসহ নানা আয়োজনের প্রধান ভেন্যু ছিল এটি। প্রতিবছর ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নাট্যদল এসে এখানে নাট্যোৎসব আয়োজন করত। ফেব্রুয়ারি মাসে হল প্রাঙ্গণে বসত বইমেলা। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে হতো নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কনসার্ট।

স্থানীয় প্রবীণ ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা জানান, একসময় টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মূলত ভাসানী হলকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হতো। হলটি ঘিরে নিয়মিত নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের আড্ডা বসত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠন নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত সংস্কারের অভাবে ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। প্রায় এক যুগ আগে প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। এরপর থেকেই বন্ধ রয়েছে এর কার্যক্রম।

২০১৫ সালে হলটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় ভবনের বিভিন্ন স্থানে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। ছাদ ও দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ছে। ভেতরের অধিকাংশ কক্ষ দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। সেগুলোতে জমেছে ধুলোবালি ও ময়লা-আবর্জনা।

টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মতে, ভাসানী হল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বড় পরিসরে অনুষ্ঠান বা নাটক মঞ্চস্থ করার মতো আধুনিক মিলনায়তনের সংকটে পড়েছে জেলার সাংস্কৃতিক অঙ্গন। বর্তমানে শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠান করতে হলেও শহরের কেন্দ্র থেকে দূরে হওয়ায় বিশেষ করে রাতে সেখানে দর্শক সমাগম কমে যায়।

সুরকার, গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পী ফিরোজ আহমেদ বাচ্চু বলেন, ভাসানী হলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন। একসময় জেলার প্রায় সব বড় সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠান এই মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হতো। হলটি ছিল নাট্যচর্চা ও সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়মিত আড্ডার কেন্দ্র। এখন আগের মতো বড় আয়োজন করা সম্ভব হয় না।

কবি মাহমুদ কামাল বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই ভাসানী হল পুনর্নির্মাণ বা সংস্কারের দাবি রয়েছে। মওলানা ভাসানীর নামে নামকরণ করা এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রক্ষায় বর্তমান সরকারের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

টাঙ্গাইল ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান খান বলেন, টাঙ্গাইল একটি পুরোনো ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যসমৃদ্ধ জেলা। ভাসানী হল জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধ থেকে তরুণদের দূরে রাখতে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো জরুরি। এজন্য একটি আধুনিক অডিটরিয়াম প্রয়োজন। তিনি দ্রুত ভাসানী হলের পূর্ণাঙ্গ আধুনিকায়নের দাবি জানান।

দীর্ঘ অবহেলার পর চলতি বছরের ১২ জুন টাঙ্গাইল সদর আসনের সংসদ সদস্য ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ভাসানী হল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে তিনি দ্রুত হলটির পূর্ণাঙ্গ সংস্কারকাজ শুরুর জন্য সংশ্লিষ্ট গণপূর্ত বিভাগকে নির্দেশ দেন।

সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ভাসানী হল টাঙ্গাইলের অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এটি পুনর্নির্মাণের ব্যাপারে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাস নয়, দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে ভাসানী হলকে আধুনিকায়ন করে আবারও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা হবে। একই সঙ্গে ভবনটির বর্তমান বেহাল দশা ও রাতে অপরাধীদের আড্ডা বন্ধ করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। তা না হলে টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই স্মারকটি একদিন চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪