বাগেরহাট প্রতিনিধি: বাগেরহাট পৌরবাসীর সুপেয় পানির সংকট নিরসনে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে আছে। ২০২১ সালের জুনে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর কয়েক মাস পরীক্ষামূলকভাবে পানি সরবরাহ করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর প্রায় চার বছর ধরে কোটি টাকার প্রকল্পটি ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
প্রকল্পটির আওতায় ভৈরব নদ থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি এনে ঐতিহ্যবাহী পচা দিঘিতে সংরক্ষণ এবং পরে ট্রিটমেন্ট প্লান্টে পরিশোধন করে পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। তবে প্রকল্পটি সচল না থাকায় সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়নি।
অন্যদিকে, পানি সংরক্ষণের জন্য ব্যবহারের কথা থাকা পচা দিঘিটি দীর্ঘদিন ধরে ইজারা দিয়ে মাছ চাষ ও মাছ ধরার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) থেকে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত দুই দিনব্যাপী দিঘিতে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা হাজারেরও বেশি সৌখিন মাছ শিকারি অংশ নেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, দিঘির চারপাশে ১০৮টি ঘাটে মাছ ধরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি ঘাটের জন্য ২৫ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। এতে আয় হয়েছে প্রায় ২৭ লাখ টাকা। আয়োজকদের দাবি, দুই দিনে শত মণের বেশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শিকার করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাছ ধরার সময় কেমিক্যালযুক্ত টোপ ও বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহারের কারণে দিঘির পানি দূষিত হচ্ছে। মাছ ধরার পর পানিতে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয় এবং কখনো কখনো মাছ মারা যায়। দিঘির পানিতে পলিথিন, খাবারের প্যাকেট, পানির বোতল, সিগারেটের প্যাকেট ও ওয়ানটাইম প্লেটসহ বিভিন্ন বর্জ্যও ভাসতে দেখা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রমজান বলেন, দিঘির পানি তারা রান্না, গোসলসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করেন। মাছ ধরার সময় কেমিক্যাল ব্যবহারের কারণে পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। আগে এ পানি পান করা হলেও এখন তা সম্ভব নয়।
আরেক বাসিন্দা শিমুল বলেন, মাছ ধরার কারণে পানির গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে এবং আশপাশে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ইমন শেখ বলেন, দিঘির পানি শোধন করে পৌরবাসীর মধ্যে সরবরাহ করা গেলে পানির সংকট অনেকটাই কমবে।
তবে দিঘিটির ইজারাদার ও মৎস্যজীবী লীগের নেতা মো. আলমগীর হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তারা কোনো সার বা কীটনাশক ব্যবহার করেন না। মাছের জন্য উপকারী প্রাকৃতিক খাবারই ব্যবহার করা হয়। তিনি জানান, প্রায় আট বছর ধরে তিনি সরকারের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে দিঘিটি পরিচালনা করছেন।
এদিকে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ওভারহেড ট্যাংক, পাম্প হাউস ও ট্রিটমেন্ট প্লান্টের বিভিন্ন যন্ত্রাংশে মরিচা ধরেছে। কয়েকটি মূল্যবান সরঞ্জাম চুরি হয়ে যাওয়ার কথাও জানা গেছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামো নষ্ট হওয়ার পথে।
বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, সুপেয় পানির সংকট দূর করতে প্রকল্পটি করা হয়েছিল। প্রকল্পটি পুনরায় চালুর বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। দীর্ঘমেয়াদি লিজের মেয়াদ সংক্ষিপ্ত করে পুকুরটি পানি সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা যায় কি না, সেটিও দেখা হবে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত প্রকল্পটি সচল করার পাশাপাশি পচা দিঘিকে পানি সরবরাহের মূল জলাধার হিসেবে সংরক্ষণ করা হোক। এতে একদিকে সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামো রক্ষা পাবে, অন্যদিকে বাগেরহাট পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের সুপেয় পানির সংকটও কমবে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম