| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান: বাংলাদেশের জন্য কেন রাজনৈতিক শান্তি জরুরি

reporter
  • আপডেট টাইম: সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬ ইং | ২২:৫২:০৭:অপরাহ্ন  |  ২৯০ বার পঠিত
প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান: বাংলাদেশের জন্য কেন রাজনৈতিক শান্তি জরুরি

নোমান হাসান: বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর মামলা ও গ্রেপ্তারের যে ধারাবাহিকতা দেখা যায়, তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি পুরোনো বৈশিষ্ট্য। প্রতিটি সরকারই ক্ষমতায় থাকাকালে রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং ক্ষমতার বাইরে থাকা অবস্থায় সেই নিয়ন্ত্রণের অপব্যবহারের অভিযোগ তোলে। অথচ ক্ষমতায় ফিরে এলে একই ব্যবস্থার সুবিধা গ্রহণ করতে দ্বিধা করে না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিহিংসার ধারাবাহিকতা এভাবেই টিকে আছে।

২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও এই ধারার অবসান ঘটেনি। ২০২৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারির সংঘর্ষের পর শুরু হওয়া ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ অভিযানে অন্তত ৮,৬০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গোপালগঞ্জে সহিংসতার পর মাত্র ১০টি হত্যা মামলায় ৮,৪০০-রও বেশি মানুষকে আসামি করা হয়, যাদের অধিকাংশই ছিলেন অজ্ঞাতনামা। ২০২৫ সালেই ক্ষমতাচ্যুত দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ২৪৪টি মামলায় প্রায় ৫৪ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। যৌথ বাহিনীর অভিযান ও বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ।

এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে মামলায় জড়ানোর পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এসব মামলার তদন্ত কতদূর এগিয়েছে। কোনো অপরাধের বিচার করতে হলে অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষ্য যাচাই এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন হয়। কিন্তু আন্দোলন-পরবর্তী সহিংসতা-সংক্রান্ত মামলাগুলোর মধ্যে মাত্র ১০৬টিতে চার্জশিট জমা পড়েছে। হাজার হাজার মামলার সিংহভাগে বছরের পর বছর কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না থাকলে মামলার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অনিবার্য। বিচার যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে তদন্তের এই ধীরগতি কেন? আর যদি তদন্তই না এগোয়, তাহলে এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে আসামি করার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যুক্তি কী?

এই প্রশ্নটি কেবল ২০২৪-পরবর্তী পরিস্থিতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অতীতেও বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সেই তালিকায় নাম বদলেছে, কিন্তু মামলাকে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির উপায় হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বদলায়নি। দুঃখজনকভাবে, ক্ষমতার বাইরে থাকলে যে আচরণকে অন্যায় বলা হয়, ক্ষমতায় গেলে সেই আচরণই অনেক সময় রাজনৈতিক প্রয়োজন হিসেবে বিবেচিত হয়।

মামলার এই বিস্তার বিচারব্যবস্থার ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করে। আদালতে মামলার সংখ্যা বাড়ে, তদন্তের সক্ষমতা সীমিত থাকে, আর প্রকৃত অপরাধের বিচার দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে পড়ে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার কারণে বিচারব্যবস্থা যদি তার সময় ও সম্পদ বিপুলসংখ্যক মামলার পেছনে ব্যয় করে, তাহলে সাধারণ ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিরোধের নিষ্পত্তি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ন্যায়বিচারপ্রার্থীরা তখন এমন একটি ব্যবস্থার মুখোমুখি হন, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার পরিবর্তন বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এর প্রভাবও কম নয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কর্মকর্তাদের আনুগত্য বদলে গেলে প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। থানা-পুলিশ থেকে জেলা প্রশাসন পর্যন্ত রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে যদি কর্মকর্তাদের কাজের পরিবেশ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন হয়। সাধারণ মানুষের কাছে আদালত ও প্রশাসন তখন স্থায়ী ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আস্থা হারায়।

রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব অর্থনীতিতেও স্পষ্ট। বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ এক পর্যায়ে ছয় বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রমিক আন্দোলন ও অর্থনৈতিক সংকট এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তবে এই পরিস্থিতিতে শুধু বিদেশি বিনিয়োগকারীরাই পিছিয়ে যাননি, দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়েছেন। বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রতিকূল বিনিয়োগ পরিবেশ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশীয় বিনিয়োগ যখন দুরবস্থায় পড়ে, তখন বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশাও বাস্তবসম্মত থাকে না।

একজন কোরীয় বিনিয়োগকারী প্রতিনিধি বলেছেন, বঙ্গোপসাগর উপকূলে বাংলাদেশের অবস্থান এবং বিশাল ভোক্তা বাজার থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রতিশ্রুতি দিলেও প্রকৃত অর্থে ঝুঁকি নিতে রাজি হন না। এই বক্তব্যের তাৎপর্য রয়েছে। বিনিয়োগকারীর কাছে বাজারের সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ সম্পর্কে আস্থা থাকা দরকার। একটি দেশে বিনিয়োগ করার পর সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে নীতি, প্রশাসনিক আচরণ কিংবা ব্যবসায়িক নিরাপত্তা বদলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকলে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়াই স্বাভাবিক।

ব্যবসায়ী নেতারাও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠনের নেতৃত্ব জানিয়েছে, উচ্চ সুদহার ও মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগ পরিবেশে আস্থা পুনর্গঠনের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যমান ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুঁকি না নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পথ বেছে নিচ্ছেন। নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে অপেক্ষা করার এই প্রবণতা কারখানা সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত করার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসানের জন্য প্রথম যে বিষয়টি জরুরি, তা হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা এ ক্ষেত্রে মৌলিক পদক্ষেপ। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চের রায়ে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার শেষ বাধা কাগজে-কলমে দূর হয়। একই রায়ে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনরুজ্জীবিত করে নিম্ন আদালতের বিচারকদের ওপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল একটি রায় বা আইনি কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না। বিচারকদের নিজস্ব সংগঠনও সতর্ক করেছে, বিচার বিভাগ প্রকৃত অর্থে স্বাধীন না হলে ভবিষ্যতে একে সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহারের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

এই সতর্কতার কারণ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিচারক নিয়োগ, বদলি ও শৃঙ্খলাবিধানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বজায় থাকলে আইনি সংস্কারের কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়বে। বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার অর্থ শুধু নির্বাহী বিভাগের আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ কমানো নয়, এমন একটি বাস্তব ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে বিচারকরা রাজনৈতিক ক্ষমতার চাপ থেকে মুক্ত থেকে কাজ করতে পারেন। কোনো সরকারই যাতে আদালতকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সেই নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

নির্বাচনব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের নির্বাচনী কাঠামো বহুবার সংস্কারের মধ্য দিয়ে গেছে। তবু নির্বাচন কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে। অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। একটি নির্বাচন কমিশন দলীয় প্রভাবমুক্ত নিয়োগ, স্বচ্ছ ভোটার তালিকা ও নিরপেক্ষ প্রশাসনিক সহায়তার মাধ্যমে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে নির্বাচনের ফলাফল সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। পরাজিত পক্ষও পরবর্তী নির্বাচনে অংশগ্রহণের আস্থা পায়। কিন্তু নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থা না থাকলে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ও প্রতিহিংসার প্রবণতা ফিরে আসতে পারে।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও একটি ন্যূনতম সমঝোতা দরকার। ক্ষমতায় যাওয়া মানেই প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার অধিকার পাওয়া নয়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক আচরণে এই সীমারেখা বারবার অতিক্রান্ত হয়েছে। দলগুলো ক্ষমতার বাইরে থাকলে নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান ও আইনের শাসনের দাবি তোলে, অথচ ক্ষমতায় গেলে একই প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারে না। এই দ্বৈততা দূর না হলে কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

বস্তুত, প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ করা সহজ নয়। কারণ, এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ক্ষমতার ব্যবহার, রাজনৈতিক দলের পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস। তবু সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রগুলো স্পষ্ট। বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা, নির্বাচনব্যবস্থাকে প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষ করা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস না করার একটি স্থায়ী সমঝোতা গড়ে তোলা—এই তিনটি উদ্যোগ ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা কঠিন।

প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক দলগুলো কি ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের নীতিও পরিবর্তন করবে, নাকি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করবে? যতদিন ক্ষমতার পালাবদল মানেই নতুন মামলার সূচনা, ততদিন রাজনৈতিক শান্তি কেবল একটি প্রত্যাশা হয়ে থাকবে। আদালতের স্বাধীনতা, নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক সহাবস্থানের নীতি প্রতিষ্ঠা না হলে আসামির তালিকা বদলাবে, কিন্তু প্রতিহিংসার কাঠামো অক্ষত থাকবে। আর সেই কাঠামো অক্ষত থাকলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা—দুটিই অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকে যাবে। তা-ই যদি হতে থাকে, তবে বাংলাদেশ এগোবে কীভাবে?

লেখক : নোমান হাসান, সিনিয়র সাংবাদিক

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪