| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

৮০ বছর ধরে বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়ার ভরসা ঐতিহাসিক মুসাফিরখানা

reporter
  • আপডেট টাইম: অক্টোবর ২২, ২০২৬ ইং | ১৯:১৬:৫৬:অপরাহ্ন  |  ৭৭৪ বার পঠিত
৮০ বছর ধরে বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়ার ভরসা ঐতিহাসিক মুসাফিরখানা

রঞ্জন কৃষ্ণ পন্ডিত, টাঙ্গাইল: পকেটে টাকা নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই—তবুও খাবার ও নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয় না কাউকে। দূরদূরান্ত থেকে আসা পথচারী, অসচ্ছল মানুষ ও ভক্ত-অনুসারীদের জন্য প্রায় আট দশক ধরে বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে আসছে টাঙ্গাইলের সন্তোষে অবস্থিত ঐতিহাসিক মুসাফিরখানা। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জনকল্যাণমুখী দর্শনের প্রতিফলন ঘটানো এই প্রতিষ্ঠান আজও বহন করছে মানবতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত।

জানা যায়, ১৯৪৬ সালে মওলানা ভাসানী নিজ হাতে এই সেবাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। কৃষক, শ্রমিক ও নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে আজীবন সংগ্রাম করা এই নেতার সাধারণ মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতার স্মারক হয়ে আছে মুসাফিরখানাটি। সময়ের পরিবর্তন ও আর্থসামাজিক নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটির মানবিক কার্যক্রমে ছেদ পড়েনি। এখানে আগতদের পরিচয় কিংবা আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা না করে সাধ্যমতো খাবার ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়।

মুসাফিরখানাটির খ্যাতি এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়েছে। সম্প্রতি ভারতের আসামের লক্ষ্মীপুরের গোয়ালপাড়া থেকে তিন ব্যবসায়ী সন্তোষে আসেন। তাঁদের একজন মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা ভাসানী হুজুরের অনুসারী ছিলেন। তাঁদের কাছে হুজুরের অনেক গল্প শুনেছি। আজ সশরীরে সন্তোষে এসে মুসাফিরখানায় যে আতিথেয়তা ও সেবা পেলাম, তা এককথায় চমৎকার। টাঙ্গাইলে এসে আমাদের দারুণ লাগছে।’

আরেক ব্যবসায়ী সানিদুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে এসেই প্রথমে হুজুরের মাজার জিয়ারত করেছি। বাবা-মায়ের কাছে ভাসানীর গৌরবময় ইতিহাস শুনে বড় হয়েছি। আগে শুনতাম, তাঁর প্রতিষ্ঠিত মুসাফিরখানায় থাকা-খাওয়া সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে। এখানে এসে সেই কথার বাস্তব প্রমাণ পেলাম।’

একই ধরনের অনুভূতির কথা জানিয়েছেন শামসুল, আরেফিন, নওশাদ, খালেক, আসলাম, জাহাঙ্গীর, ছিফাত, লস্কর, তামজিদুল, হরিপদ, রাখাল, সুশান্ত, আজগর, নেহাল, পারভেজ ও শাকুরসহ অনেকে।

মুসাফিরখানায় আগতদের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন একদল নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ভক্ত-অনুসারীদের খাবারের দেখভাল করেন আমেনা বেগম। তিনি বলেন, দর্শনার্থীরা এখানে এসে মওলানা ভাসানীর মাজারসহ বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করেন। কেউ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বাজার করে নিয়ে আসেন, আবার অনেকে আসেন একেবারে খালি হাতে। তবে সবার জন্যই সাধ্যমতো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।

মুসাফিরখানার রান্নাঘরে প্রায় ৬০ বছর ধরে কাজ করছেন চান মিয়া। তিনি জানান, প্রতিদিন নিয়মিত দুই বেলা খাবার পরিবেশন করা হয়। এ ছাড়া প্রতি বৃহস্পতিবার ও চান্দ্র মাসের ১১ তারিখে বিশেষ তবারক বিতরণ করা হয়। এসব দিনে দূরদূরান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক ভক্ত ও অনুসারীর সমাগম ঘটে। এখানে আসা প্রত্যেকের জন্য বিনা মূল্যে থাকা ও খাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

মওলানা ভাসানীর দৌহিত্র ও ন্যাপ ভাসানীর সভাপতি হাসরত খান ভাসানী বলেন, ‘১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় ৮০ বছর ধরে এই কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে। মূলত হুজুরের মুরিদান, ভক্ত ও মুসাফিরখানায় আসা সাধারণ মানুষের আন্তরিক সহযোগিতাতেই এই মহতী উদ্যোগ আজও সচল রয়েছে।’

মওলানা ভাসানীর মানবিক দর্শনের কথা স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, ‘মওলানা ভাসানী হুজুর বলতেন, তাঁর দরগায় কেউ এলে তাকে যেন অন্তত একটি রুটি দেওয়া হয়। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী আজ পর্যন্ত এখান থেকে কেউ ক্ষুধার্ত মুখে ফিরে যাননি। আল্লাহর রহমতে ভবিষ্যতেও এই সেবামূলক কার্যক্রম চলমান থাকবে।’

মুসাফিরখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম শহিদুল ইসলাম বলেন, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর স্মৃতি ও আদর্শ ধারণ করে তাঁর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সংগঠনগুলোকে নতুন করে উজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিশেষ করে ঐতিহাসিক মুসাফিরখানাটির আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে, যাতে দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষ আরও সুচারুভাবে সেবা পেতে পারেন।

উপাচার্য আরও বলেন, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করাই তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য। গবেষণা ও মেধার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের উৎকর্ষ অর্জনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও দক্ষতায় গড়ে তোলা হবে, যাতে তাঁরা বিশ্বপরিসরে অবদান রাখতে পারেন।

প্রায় ৮০ বছর ধরে সন্তোষের এই মুসাফিরখানা প্রমাণ করে চলেছে, মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সেবার আদর্শ সময়ের সঙ্গে ম্লান হয় না। মওলানা ভাসানীর মানবিক দর্শন ধারণ করে প্রতিষ্ঠানটি আজও অসহায় ও পথচলতি মানুষের আশ্রয় ও আহারের নির্ভরযোগ্য ঠিকানা।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪