ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি : উত্তরের প্রান্তিক জনপদ ঠাকুরগাঁও—যেখানে বড় কোনো শিল্পকলকারখানা নেই। কৃষিই এখানকার মানুষের প্রধান ভরসা। ফলে জীবিকার লড়াই এখানে নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন্তু এই প্রান্তিক জনপদেই এখন বদলের হাওয়া বইছে। সেই পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা, জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা।
জেলার প্রথম নারী ডিসি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি শুধু প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে নয়, নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও এনেছেন নবজাগরণ। তাঁর উদ্যোগে ‘তৃণমূল পর্যায়ে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে নারী উদ্যোক্তাদের বিকাশ সাধন’ প্রকল্প এখন ঠাকুরগাঁওয়ের নারী সমাজে নতুন আত্মবিশ্বাসের নাম।
মোকছেদা বেগম এখন পরিচিত মুখ। নিজ হাতে তৈরি পাপোষ ও বুটিক প্রিন্টের কাজ করেন, অন্য নারীদেরও শেখান। তাঁর চোখে ইশরাত ফারজানা শুধু একজন ডিসি নন—তিনি পথের দিশারী, অনুপ্রেরণার উৎস।
জেলার বিভিন্ন প্রান্তে এখন নারীরা মৃৎশিল্প, বুটিক প্রিন্ট, বিউটিশিয়ান, রেস্টুরেন্ট ব্যবসা, এমনকি হাঁস-মুরগি খামারেও যুক্ত হচ্ছেন। কেউ ঘরোয়া খাবার বিক্রি করছেন, কেউ অনলাইনে হাতে তৈরি পণ্য বিক্রি করছেন। এতে যেমন আত্মনির্ভরশীলতা বাড়ছে, তেমনি বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি।
ঠাকুরগাঁও শহরের হাজীপাড়া এলাকায় গড়ে উঠেছে তিনটি নারী-নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠান—‘ফাইভ সিস্টার ফুট টুইস্ট’, ‘রংধনু বুটিকস’ ও ‘ওমেন্স ওয়ার্ল্ড বিউটি পার্লার’।
‘ফাইভ সিস্টার ফুট টুইস্ট’-এর উদ্যোক্তা জাকিয়া সুলতানা জানান, “ডিসি ম্যাডাম শুধু পুঁজি দেননি, সাহসও দিয়েছেন। তাঁর সহযোগিতায় আমরা এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি।”
রেস্টুরেন্টটিতে প্রতিদিন ৬০–৭০ জন ক্রেতা আসেন, বিক্রি হয় তিন থেকে চার হাজার টাকার খাবার। পুলিশ সদস্য জহিরুল ইসলাম বলেন, “এখানকার ঘরোয়া স্বাদ অন্য কোথাও মেলে না। প্রতিদিনই আসি—তৃপ্তি পাই।”
‘রংধনু বুটিকস’-এ ১০ জন নারী তৈরি করছেন কুশিকাঁথা, ব্লক-বাটিক, নকশিকাঁথা ও হ্যান্ডপ্রিন্টসহ দেশীয় কারুকাজের নানা পণ্য। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের দেওয়া হয়েছে ১৫ হাজার টাকা মূলধন, দোকানের সাজসজ্জা, সেলাই মেশিন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম—এমনকি প্রথম চার মাসের দোকানভাড়াও পরিশোধ করা হয়েছে।
‘ওমেন্স ওয়ার্ল্ড বিউটি পার্লার’-এর উদ্যোক্তা লিজা আক্তার ও মুসলিমা খাতুন বলেন, “এই প্রকল্পের সহায়তা না পেলে আমরা কখনো পার্লার খুলতে পারতাম না। এখন নিজেরাই উপার্জন করছি, পরিবারও এগোচ্ছে।”
জেলায় প্রতিষ্ঠিত কারুশিল্প ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রতিবছর গড়ে ৩৭৫ জন নারী টেইলারিং, বিউটিফিকেশন, ওয়েল্ডিং ও ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশনে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। এখানকার তৈরি পণ্য ইতোমধ্যে রপ্তানি হচ্ছে ইতালি, জার্মানি, মালয়েশিয়া, নেপাল ও ভারতে।
প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক চন্দনা ঘোষ বলেন, “এই প্রশিক্ষণ শুধু পণ্য তৈরি নয়, আত্মবিশ্বাস তৈরি করছে। এখন আমাদের নারীরা বিদেশে পণ্য পাঠাচ্ছেন—যা একসময় কল্পনাতেও ছিল না।”
আকচা ইউনিয়নের পালপাড়া গ্রামের রাধারানী পাল জানান, “আগে শুধু হাঁড়িপাতিল বানাতাম, এখন ফুলদানি, গয়না, সাজসজ্জার পণ্য বানাচ্ছি। ডিসি ম্যাডাম পাশে আছেন বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।”
মৃৎশিল্প, কারুশিল্প, খাবার তৈরি—সব ক্ষেত্রেই নারীদের হাতে ফিরছে গ্রামীণ ঐতিহ্য।
জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য শামীম বলেন, সম্প্রতি ডিসি ইশরাত ফারজানা উদ্বোধন করেছেন রাণীশংকৈল রাঙ্গাটুঙ্গী ইউনাইটেড মহিলা ফুটবল একাডেমির প্রাচীর নির্মাণকাজ। নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য এটি বড় প্রাপ্তি।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মনোতোষ কুমার বলেন, “একজন নারী প্রশাসকের আন্তরিকতা, দূরদৃষ্টি ও সহানুভূতিই আজ ঠাকুরগাঁওয়ের শত শত নারীর জীবনে আলো জ্বালিয়েছে। ইশরাত ফারজানা এখন শুধু প্রশাসক নন—তিনি পরিবর্তনের প্রতীক।”
রিপোর্টার্স২৪/এসএন