শিমুল চৌধুরী ধ্রুব: মানুষের সঙ্গে কুকুরের বিশ্বস্ত বন্ধুত্বের ইতিহাস পুরোনো। যার কাছে কুকুর একটু খাবার কিংবা আশ্রয় পায়, তার বিপদে ঝাপিয়ে পড়ে নিঃসংকোচে। কুকুরকে নানান রকম প্রশিক্ষণ দেওয়ারও সুযোগ আছে। এমনকি অপরাধজগতের নানান বিষয়ে মানুষকে সাহায্য করতে পরম বন্ধু হয়ে কাজ করে লড়াকু এই প্রাণী।
এ ধরনের কাজে নিযুক্ত করা হয় বিশেষ জাতের কুকুর। পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে তো বটেই, বাংলাদেশেও নির্দিষ্ট ধরনের কাজে লাগানো হয় প্রশিক্ষিত কুকুরদের। এমন কিছু কুকুর কাজ করে ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের সঙ্গেও।
যে পেশা বা কাজের সঙ্গে অপরাধজগৎ সম্পর্কিত, তাতে নিয়োজিত থাকতে হলে শারীরিক শ্রম স্বাভাবিকভাবেই একটু বেশি হয়। তরুণ বয়সী কুকুর যেভাবে এই কাজ করতে পারবে, একটু বেশি বয়সী কুকুর তা আর পারবে না। অর্থাৎ একটা নির্দিষ্ট বয়সে অবসরে পাঠানো হয় এই কুকুরদের।
উন্নত বিশ্বের প্রায় দেশেই এই ধরনের বিশেষ কুকুরদের দেয়া হয় বিশেষ সম্মান। অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতাভেদে তাদের থাকে আলাদা পোস্ট-পজিশন, ড্রেস, র্যাংকিং ব্যাচসহ নানান কিছু। সম্মানী হিসেবে বেতনের পাশাপাশি নানান ভাতাও বরাদ্ধ থাকে এই বিশেষ কুকুরদের জন্য। এদের মৃত্যু ঘটলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয় সম্মান। বিশেষ আয়োজনে করা হয় সমাহিত। আর যখন এদের অবসরে পাঠানো হয়, তখনও তাদের ভরণ-পোষণসহ যাবতীয় সকল কিছুর দায়িত্বই থাকে রাষ্ট্রের।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশেরও (ডিএমপি) রয়েছে এমন বেশ কিছু প্রশিক্ষিত কুকুর। তাদেরই তিনজন হলো ফিন, কোরি ও স্যাম। বয়স হয়ে যাওয়ায় কর্মদক্ষতা কমে গেছে ল্যাব্রাডর ও জার্মান শেফার্ড জাতের কুকুর তিনটির। তাই বাধ্য হয়েই তাদেরকে পাঠাতে হচ্ছে অবসরে। তবে উন্নত বিশ্বের কুকরগুলোরমতো অমন সম্মাননা জুটছে না ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বিশেষায়িত কে-নাইন দলের হয়ে দীর্ঘ আট বছর ধরে কাজ করা ফিন, কোরি ও স্যামের ভাগ্যে।
দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত এই সঙ্গীদের বিক্রি করতে ক্রেতা খুঁজছে ডিএমপি। দেশের জন্য কাজ করে জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়ে দেয়া কুকুরগুলোকে বিক্রি করার জন্য মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) একটি উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। দরপত্র বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, ব্যবসায়ী, নিলাম দরদাতা, ঠিকাদার এবং পশুপ্রেমীদের একই দিনে দুপুরে একটি উন্মুক্ত নিলামে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ফিন, কোরি ও স্যাম মিরপুর-১৪ পুলিশ লাইন্সে অবস্থিত পুলিশ ‘কে-নাইন’ টিম সদর দপ্তরে উন্মুক্ত নিলামের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) তালেবুর রহমান রিপোর্টার্স২৪-কে বলেন, ‘নিয়মমাফিক সরকারি আইন অনুযায়ী এদেরকে (কুকুর তিনটি) নিলামে বিক্রি করা হবে। এরপর এই কুকুরগুলোর যাবতীয় দায়-দায়িত্ব যিনি কিনবেন তার।’
নিলামে তোলা তিনটি কুকুর সম্পর্কে জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে ওরা বাংলাদেশ পুলিশের সিটিটিসি গ্রুপের হয়ে নারকোটিক (মাদকদ্রব্য) ও এক্সপ্লোসিভ (বিস্ফোরক দ্রব্য) তল্লাশির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে। বিশেষ করে বইমেলা, সভা–সমাবেশ, এয়ারপোর্টে কার্গো চেকিংয়ের মতো দায়িত্ব সন্তোষজনকভাবে সামলাতে পারে এই জাতের কুকুরগুলো।
জানা যায়, কুকুর তিনটির মধ্যে, ফিন পুরুষ ল্যাব্রাডর কুকুর। কোরি স্ত্রী ল্যাব্রাডর। আর স্যাম পুরুষ জার্মান শেফার্ড। তিনটির বয়সই আট বছর। এত বয়সের কারণে তারা আর বিস্ফোরক শনাক্ত করা, অনুসন্ধান অভিযান বা টহল দায়িত্বের মতো কঠিন কাজ করতে পারছে না। তবে কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তাদের স্বাস্থ্য এখনো ভালো আছে এবং সহজেই পোষা প্রাণী হিসেবে স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারবে।
২০১৬ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বিস্ফোরক ও বিপজ্জনক বস্তু শনাক্ত করে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আরও ভালোভাবে লড়াই করার জন্য একটি বিশেষায়িত কে-নাইন ইউনিট গঠন করে, যা ব্যাপকভাবে ‘K-9’ নামে পরিচিত। দশটি কুকুরের মধ্যে ছয়টি জার্মান শেফার্ড ও চারটি ল্যাব্রাডর রিট্রিভার যুক্তরাজ্য থেকে কেনা হয়। বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কুকুরগুলো সিটিটিসি বিভাগের স্পেশাল অ্যাকশন ইউনিটের সদস্য হিসেবে কাজ করতো।
বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কুকুরের বিষয়ে ডিএমপির পাঁচজন পুলিশ কর্মকর্তা যুক্তরাজ্যে প্রশিক্ষণ নেন। পরবর্তীসময়ে কুকুরদের প্রশিক্ষণ দেন। এই পাঁচজন কর্মকর্তা কে-নাইন স্কোয়াড পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেন আরও ২৫ জন পুলিশ সদস্যকে।
সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ দমনে বিস্ফোরক ও বিপজ্জনক বস্তু খুঁজে বের করার কাজে বিশেষ প্রশিক্ষণ রয়েছে এই ইউনিটের কুকুরদের। তিন কুকুরের প্রতিটিরই বয়স পেরিয়েছে আট বছর। ফিন ও কোরি ল্যাব্রাডর জাতের কুকুর। আর স্যাম জার্মান শেফার্ড। যুক্তরাজ্য থেকে আনা কুকুর তিনটির জন্য এই বিশেষায়িত ইউনিটে কাজ করার সময় ফুরিয়েছে।
সিটিটিসির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নাজমুল হাসান বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যবহৃত কুকুরদের নির্দিষ্ট সেবাকাল থাকে। পুলিশ সদর দপ্তরের অনুমতি নিয়ে তিনটি কুকুর নিলামে তোলা হচ্ছে। আমরা চাই, তারা যেন জীবনের বাকি সময়টা নিরাপদ ও স্নেহময় পরিবেশে কাটাতে পারে। নিলাম পশু কল্যাণ আইনের নিয়ম মেনে করা হচ্ছে।’
কে-নাইন স্কোয়াডের পুলিশ পরিদর্শক ফখরুল আলম বলেন, ‘এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ জনের বেশি মানুষ যোগাযোগ করেছেন। স্পটে এসে একজন নিলামকারী বা তার মনোনীত প্রতিনিধি এক হাজার টাকা জমা দিয়ে নিলামে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। নিলাম চলাকালীন যিনি সর্বোচ্চ দাম বলবেন তিনি কুকুরের মালিক হতে পারবেন।’
যে কুকুরগুলো নিলামে তোলা হচ্ছে তাদের খাবার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ব্রয়লার মুরগির মাংস এবং চাল-সবজি দিয়ে খিচুড়ি রান্না খায় তারা। দিনে একবেলা খাওয়ানো হয়।’
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব