রিয়াজুল হক
স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সুবিধার বিস্তারের সাথে সাথে আমাদের জীবনে যেমন বহু ইতিবাচক সুযোগ তৈরি হয়েছে, তেমনই উঁকি দিয়েছে কিছু গভীর সামাজিক সংকট। এর মধ্যে অত্যন্ত আলোচিত ও দ্রুত ছড়ানো সমস্যা হলো অনলাইন জুয়া। ঘরে বসে মোবাইল স্ক্রিনে আঙুল চালালেই বিভিন্ন খেলা, বাজি, ক্যাসিনো সাইটে প্রবেশ করা যায় এবং এটি বহু মানুষের কাছে যেন সহজ আয়ের নতুন পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে! কিন্তু বাস্তবে এটি একটি নীরব, দ্রুত বিস্তারমান আসক্তি, যা সমাজ, অর্থনীতি এবং পারিবারিক শান্তির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বিস্তার গত কয়েক বছরে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব কিংবা বিভিন্ন অ্যাপ ইত্যাদি সব জায়গাতেই এখন জুয়ার বিজ্ঞাপন বা রেফারেল লিংক চোখে পড়ে। অনেকে এটিকে গেম বা বিনোদনের মোড়কে উপস্থাপন করে, কিন্তু এর ভেতরের কাঠামো পুরোপুরি জুয়া খেলা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, এই অনলাইন জুয়া খেলছে মূলত তরুণ প্রজন্ম। যারা হয়তো এখনও নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করেনি, কিন্তু দ্রুত আয়ের লোভে মোবাইলের মাধ্যমে জড়াচ্ছে বিপজ্জনক এক নেশায়।
অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এটি অদৃশ্য। আগে জুয়া খেলতে গেলে নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে হতো, লোকজন জানত। সামাজিক বাধা ছিল। এখন ঘরে বসে, পরিবারের অগোচরে, মধ্যরাতে কিংবা ক্লাসের ফাঁকে—যেকোনো সময়ে জুয়া খেলা, বাজি ধরা সম্ভব। ফলে পরিবার বুঝতে পারার আগেই একজন তরুণ বা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে যায়। অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে, মাসের বেতন, শিক্ষার ফি, এমনকি ধার-কর্জ করা টাকা পর্যন্ত হারিয়ে যাচ্ছে অনলাইন জুয়ায়।
এই জুয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর আরেকটি কৌশল হলো, ‘শুরুতে লাভ দেখানো’। নতুন ব্যবহারকারীদের প্রথম দিকে সামান্য লাভের লোভ দেখানো হয়, যা দেখে খেলোয়াড় মনে করে, ‘এটি আয়ের সহজ পথ’। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে সে পড়ে যায় ক্ষতির চক্রে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে জুয়াড়ি আরও বেশি টাকা বাজি ধরে, যা তাকে আরও বিপদে ফেলে। এটি একধরনের মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ, দ্রুত ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত আরও ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়।
আইনের দিক থেকেও অনলাইন জুয়া স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদেশ থেকে পরিচালিত সাইট, ভিপিএন ব্যবহারের সুযোগ, এনক্রিপ্টেড পেমেন্ট চ্যানেল, সব মিলিয়ে জুয়া বন্ধ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সময়ে র্যাব ও পুলিশের অভিযান দেখে বোঝা গেছে, এই নেটওয়ার্ক অত্যন্ত সংগঠিত, লাভজনক এবং প্রযুক্তি চালিত। ফলে শুধুমাত্র আইন দিয়ে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, পরিবারভিত্তিক তদারকি এবং প্রযুক্তিগত নজরদারির সমন্বিত উদ্যোগ।
জুয়া শুধু টাকার ক্ষতি করে না, এটি মানুষের মানসিক স্থিতি, ব্যক্তিত্ব, কাজের আগ্রহ এবং জীবনের প্রতি ইতিবাচকতা ধ্বংস করে দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন জুয়া একধরনের ডিজিটাল ড্রাগ। এর প্রতি আসক্তি মস্তিষ্কের ওপর এমনভাবে প্রভাবিত করে, যা মাদকাসক্তির মতো আচরণ সৃষ্টি করে। ফলে ব্যবহারকারী ক্ষতি বুঝেও থামতে পারে না। সাম্প্রতিক সময়ে ঋণ নিয়ে জুয়া খেলতে গিয়ে আত্মহত্যা বা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও দেখা যাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
এই পরিস্থিতি রোধে কয়েকটি বাস্তব পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, পরিবারে ডিজিটাল আচরণ সম্পর্কে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্কুল-কলেজে অনলাইন জুয়ার ক্ষতি নিয়ে সচেতনতা ক্লাস বা সেমিনার আয়োজন করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, জুয়া সাইটগুলোতে আর্থিক লেনদেনের পথ বন্ধে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমেও প্রচারণা বাড়াতে হবে। অনলাইন জুয়া যে সাধারণ বিনোদন নয়; এটি ধীরে ধীরে মানুষকে নিঃস্ব করে দেয়, সেই বার্তা বারবার তুলে ধরতে হবে।
অনলাইন জুয়া আজকের সমাজের জন্য এক নীরব মহামার। শুধু আইন দিয়ে নয়, পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এটি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রযুক্তির যুগে ডিজিটাল সুবিধা যেমন দরকার, তেমনি এর অপব্যবহারও রোধ করা অপরিহার্য। নাহলে অনলাইন জুয়া ক্রমেই আমাদের সমাজের অভ্যন্তরে আরও গভীর ক্ষত তৈরি করবে।
লেখক:অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।