রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: শুরু হলো বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের সর্বোচ্চ গৌরবের সময়—১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ত্যাগকে আবারও নতুন করে স্মরণ করবে জাতি। লাখো শহীদের আত্মত্যাগে অর্জিত স্বাধীনতার মাসে শহীদদের প্রতি জানানো হবে গভীর শ্রদ্ধা।
প্রতি বছরের মতো এবারও বিজয়ের মাস উদযাপনে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক কর্মসূচি। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে মাসব্যাপী বিভিন্ন আয়োজন হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনও পালন করবে নিজস্ব কর্মসূচি।
স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে বাঙালির স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয় এই ডিসেম্বরেই। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সবুজের বুকে লাল সূর্য-খচিত পতাকার উন্মোচন ঘটে বীর বাঙালির। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে গঠিত স্বাধীনতার স্বপ্ন পূর্ণতা পায় ১৯৭১ সালের এ মাসে।
ব্রিটিশদের কাছ থেকে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা পাওয়ার পর ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি এ অঞ্চলের মানুষের।
পশ্চিম পাকিস্তানিদের ঔপনিবেশিক শাসনের কবলে পড়ে পূর্ব বাংলার মানুষ। ২৩ বছর চলে এই শোষণ-বঞ্চনা। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন দিয়ে শুরু করে ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও সত্তরের নির্বাচনের পথ ধরে চলে আসে ঐতিহাসিক একাত্তর।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। ২৫ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বাঙালি জনগণের ওপর আক্রমণ শুরু করে। তাদের পরিকল্পিত গণহত্যা ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর পর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ (বীর উত্তম) লিখেছেন, ব্যাটালিয়ন শক্তিশালী হতে শুরু করলে, ২৭ মার্চ বিকেলে জিয়া কালুরঘাটে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা দেন। এই ঘোষণায় তিনি বলেন, আমি, মেজর জিয়া, বাংলাদেশ মুক্তি বাহিনীর অস্থায়ী প্রধান সেনাপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।
ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই মুক্তিবাহিনীর অগ্রযাত্রায় পরাজয়ের পথে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। নিউইয়র্ক টাইমসের ১ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গেরিলা হামলা বেড়ে যাওয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী আরও নৃশংস হয়ে ওঠে। বুড়িগঙ্গা পাড়ের জিঞ্জিরাতে এক দিনে ৮৭ জন নিরীহ মানুষকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে তারা। ডিসেম্বর জুড়ে চলে পাকিস্তানি বাহিনীর শেষ চেষ্টা, দেশের বিভিন্ন স্থানে বেড়ে ওঠে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।
এ মাসেই হানাদার বাহিনী তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদর, আল-শামসদের সহযোগিতায় দেশের মেধাবি-শ্রেষ্ঠ সন্তান, বুদ্ধিজীবীদের নৃশংস হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিল। সমগ্র জাতিকে মেধাহীন করে দেওয়ার এ ধরনের ঘৃণ্য হত্যাযজ্ঞের দ্বিতীয় কোনো নজির বিশ্বে নেই।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও বিশ্লেষণে লিখিত যতীন সরকারের বই ‘পাকিস্তানের জন্মমৃত্যু-দর্শন’-এ উঠে এসেছে ডিসেম্বরের বেদনাবিধুর ঘটনাপ্রবাহ। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ১৪ ডিসেম্বর রাতে আকাশবাণীর খবরে মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, গিয়াসুদ্দিন আহমদ, সন্তোষ ভট্টাচার্য, শহীদুল্লাহ কায়সার, ড. আলিম চৌধুরী, ড. ফজলে রাব্বি, ড. মোর্তজা—এমন বহু বুদ্ধিজীবীর হত্যার সংবাদ প্রচারিত হয়। পরে জানা যায় লেখক আনোয়ার পাশাকেও সেদিন হত্যা করা হয়।
বিজয়ের পাশাপাশি শোকের বর্ণিল মিশ্রণ নিয়েই আসে ডিসেম্বর। স্বাধীনতার স্বপ্নপূরণ হলেও এর বিনিময়ে প্রাণ হারাতে হয়েছে অনেককে, হারাতে হয়েছে মা-বোনের সম্মান।
শেষ পর্যন্ত ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়, নয় মাস ব্যাপী স্বাধীনতা যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত প্রায় সকল দেশ স্বাধীনতার মাসে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।